সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট নাকি বিলিয়ন ডলার বিজনেস
(আজকের আলোচনা ভয়ংকর একটা সত্যকে তুলে ধরবে, অনেক কোম্পানি ও ইনফ্লুয়েন্সাদের মনে কষ্ট যেতে পারে। সম্পূর্ণ আলোচনা শেষ হওয়া পর্যন্ত মেজাজ খারাপ না করার জন্যে অনুরোধ করছি। আমি কখনোই এডুকেশনাল খেলনার বিপক্ষে নই, বর্তমান সময়ে এগুলোর গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে, তবে আজকের আলোচনা ঐ সব অভিভাবকদের জন্যে যারা মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত। নামি-দামি খেলনা ছাড়াও ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট সম্ভব, সন্তানকে মানুষ করার সম্ভব, তাই বোঝাতে এত বড় আলোচনা। প্লিজ শেষ হওয়া অবধি বিরুপ মন্তব্য করবেন না)
আজ সকালে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। জনৈক মা (যিনি প্যারেন্টিং ব্লগ করেন) তার চার বছরের বাচ্চার জন্য ১২ হাজার টাকা দিয়ে এক সেট মন্টেসরি খেলনা কিনেছেন। ক্যাপশনে বড় বড় করে লেখা, সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়!
একটু নিচে যেতেই আরেকটা পেইজের বিজ্ঞাপন,আপনার বাচ্চা কি পিছিয়ে পড়ছে? আজই কিনুন এই STEM টয়!
বর্তমান সময়ে ফেসবুক খুলে স্ক্রল করলেই ফিডে ভেসে আসে ঝলমলে কিছু রঙিন খেলনা, বাহারি সব ইন্সট্রুমেন্ট, হাজার টাকার ফ্ল্যাশকার্ড আর বিভিন্ন সেন্সরি টয়। একেকটা পেজ আর ফেসবুক আইডি যেন একেকটা সুসংবাদদাতা, তবে সেই সংবাদে আনন্দের চেয়ে আশঙ্কাই বেশি। (আমার আইডিতে আরো বেশি পাই,ফেসবুক অলগারিদম এর সুবাদে, যেহেতু আমি শিশুদের নিয়ে কাজ করি তারা জানে)
দাবিগুলো অনেকটা এরকম, এটা না দিলে আপনার বাচ্চা প্রতিযোগিতায় টিকবে না! এই টয় ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের জন্য মাস্ট! কিংবা সেই মোক্ষম অস্ত্র, এই খেলনা ওয়েস্টার্ন রিসার্চ প্রুভড!
আপনি যখন স্ক্রিনের ওপাশ থেকে এসব দেখছেন, আপনার চারপাশের দেয়ালগুলো তখন অন্য কথা বলছে। বাজারের থলিতে টান পড়েছে, নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। সন্তানের স্কুলের বেতন আর মায়ের ওষুধের খরচ। আরো কত কি!
মফস্বলের কোনো এক মধ্যবিত্ত ঘরে বসে আপনি যখন মাসের শেষে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন ওই পাঁচ হাজার টাকার খেলনা সেটটা আপনার কাছে শুধুমাত্র বিলাসিতা নয় বরং একটা অবাস্তব স্বপ্ন মনে হতে থাকে।
ফলাফল কী দাঁড়ায় জানেন?
একটা ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। রাতের নির্জনে, যখন সন্তানটি ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন আপনি ও আপনার জীবনসঙ্গিনী বালিশে মাথা রেখে নিজের অজান্তেই কিছু প্রশ্ন করেন,
• আমরা কি তবে একজন খারাপ মা/বাবা?
• আমাদের অসামর্থ্যের কারণে কি আমার কলিজার টুকরোটা দুনিয়া থেকে পিছিয়ে যাবে?
• আমাদের যদি টাকা থাকতো, তবে কি আমি আমার সন্তানকে আরও ভালো মানুষ বানাতে পারতাম?
একরাশ দীর্ঘশ্বাস আর না-পাওয়ার হাহাকার নিয়ে আপনারা ঘুমাতে যান। আপনাদের মনে হতে থাকে, টাকা নেই বলে আপনি হয়তো আপনার সন্তানের প্রতি অবিচার করছেন।
সম্মানিত অভিভাবক, একটু থামুন! একটা গভীর শ্বাস নিন।
আমি আজ আপনাদের বুঝিয়ে দিব, দামি খেলনা বা ইন্সট্রুমেন্ট সন্তানকে কিনে দিতে না পারা মানেই আপনি খারাপ প্যারেন্টস নন। একদমই নন!
আসলে আপনাকে একটা পরিকল্পিত গোলকধাঁধায় আটকে
ফেলা হয়েছে। আপনাকে দোষী ভাবতে শেখানো হচ্ছে যাতে সেই 'গিল্ট' বা অপরাধবোধ থেকে আপনি তাদের পকেট ভারী করেন।
চলুন, আজ পর্দার পেছনের সেই সত্যগুলো একটু ব্যবচ্ছেদ করি। জানার চেষ্টা করি, কারা আপনাকে এই মনস্তাত্ত্বিক গোলামির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপনার সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের জন্য আসলে ঠিক কী প্রয়োজন।
প্রথম সত্য: বিলিয়ন ডলারের ফাঁদ যেখানে আপনি আটকা পড়েছেন
সম্মানিত অভিভাবক, একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।
এই যে মন্টেসরি খেলনা, সেন্সরি বোর্ড, এডুকেশনাল ইন্সট্রুমেন্ট, এগুলো আসলে কী?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হলো এক বিশাল ব্যবসায়িক ব্ল্যাকহোল!
চলুন একটু সংখ্যাতত্ত্বের হিসাব নিকাশ করি। গবেষণা সংস্থা Grand View Research-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে গ্লোবাল ‘লার্নিং টয়’ মার্কেট ছিল মাত্র ৫৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তাদের প্রজেকশন কী বলছে জানেন? ২০৩০ সাল নাগাদ এই
বাজার গিয়ে ঠেকবে ১১৮ বিলিয়ন ডলারে! আমাদের দেশি টাকায় এর হিসাব করলে অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ কোটি টাকা! ভাবুন একবার! শুধু আমেরিকাতেই এই শিক্ষামূলক খেলনার বাজার প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের। আর শিক্ষামূলক ছাড়া অন্যন্য খেলনার বাজার যে কত্ত বড়, আপনি হিসাবও করতে পারবেন না।
এই যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন, এটা কি স্রেফ আপনার বাচ্চার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের টেনশনে হচ্ছে?
মোটেও না। এটা একটা বিশাল গ্লোবাল সিন্ডিকেট। তারা খুব ভালো করে জানে, একজন বাবার পকেট থেকে টাকা বের করা যতটা কঠিন, একজন মা-বাবার সন্তান বাৎসল্য আর ভয়কে পুঁজি করে টাকা বের করা তার চেয়ে হাজার গুণ সহজ।
তাই যখনই কোনো রঙিন বিজ্ঞাপন আপনার টাইমলাইনে ভেসে আসে, মনে রাখবেন, সেটা স্রেফ একটা খেলনা নয়, সেটা ১৪ লাখ কোটি টাকার ওই দানবীয় সিন্ডিকেটের একটা ছোট্ট টোপ। তারা আপনার বাচ্চার ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি চিন্তিত আপনার ওয়ালেটের স্বাস্থ্য নিয়ে।
এখন প্রশ্ন হলো, এত বড় একটা ব্যবসা টিকে থাকে কীভাবে? এরা কি আমাদের সন্তানের মেধা নিয়ে খুব চিন্তিত?
মোটেই না। এই বিশাল সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে আছে আপনার মনের এক গভীর অন্ধকার গলিতে, যার নাম 'ভয়'।
মার্কেটিং সাইকোলজিতে একটা টার্ম আছে FOMO (Fear of Missing Out)। সহজ বাংলায়, পিছিয়ে পড়ার আতঙ্ক।
আপনাকে প্রতিটা মুহূর্তে গিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিছু ভুল ধারণা:
• প্রথম ৫ বছরই সব! এই সময় এই খেলনা না দিলে আপনার বাচ্চার আইকিউ বাড়বে না।
• অমুক বাচ্চার মা ওই সেটটা কিনেছে, আপনি কেন কিপ্টেমি করছেন?
• এই STEM টয় ছাড়া আপনার বাচ্চা প্রতিযোগিতার এই যুগে স্রেফ ছিটকে পড়বে!
এই যে আপনার মনে একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ ঢুকিয়ে দেওয়া, যে আপনি কিনছেন না মানে আপনি অবহেলা করছেন, এটাই হলো তাদের সাকসেস। তারা খেলনা বিক্রি করছে না, তারা আসলে আপনার প্যারেন্টাল ইনসিকিউরিটি বা অভিভাবকত্বের নিরাপত্তাহীনতাকে এনক্যাশ করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং করুণ দৃশ্যটা কোথায় জানেন?
আপনার প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার বা ফেসবুক পেজ যখন খুব দরদ মাখা গলায় কোনো দামি খেলনার রিভিউ দিচ্ছে, তখন খেয়াল করবেন, তাদের বেশিরভাগই সেই প্রোডাক্টটা কোম্পানির কাছ থেকে গিফট হিসেবে পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার প্রতিটা বিক্রির ওপর পাচ্ছেন মোটা অংকের কমিশন।
দেখুন, ব্যবসা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সমস্যাটা বাধে তখন, যখন এই ব্যবসায়িক প্রোপাগান্ডাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন, দামি খেলনা না থাকলে আপনার সন্তান বোকা হয়ে জন্মানো নিশ্চিত!
সম্মানিত অভিভাবক, এটা একটা চরম মিথ্যা। একটা সাজানো নাটক। মেধা বিকাশের সাথে প্লাস্টিক বা কাঠের তৈরি চড়া দামের খেলনার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এটা ছাড়া আপনার সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট সম্ভব নয় এটাও ভুল। তারা মূলত আপনার পকেটের টাকা দিয়ে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ছে, আর আপনি ভাবছেন, আপনার পকেটে টাকা নেই বলে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
আসলেই কি তাই? চলুন তবে পরের ধাপে ইতিহাসের আয়নায় একটু সত্যটা দেখে নেই।
দ্বিতীয় সত্য: ইতিহাস যা আপনাকে শেখায়
সম্মানিত অভিভাবক, এবার একটু থামুন। গভীর একটা শ্বাস নিন আর স্মৃতিশক্তিকে একটু পেছনের দিকে দৌড়াতে দিন। খুব বেশি পেছনে নয়, মাত্র এক বা দুই প্রজন্ম আগে।
আচ্ছা, আপনার মা-নানী কি ছোটবেলায় কোনো মন্টেসরি টয় সেট নিয়ে বড় হয়েছিলেন? আপনার বাবা-দাদা কি তাঁর শৈশবে কোনো STEM টয় দিয়ে রোবট বানাতেন?
উত্তরটা আমরা সবাই জানি, "না"।
তাঁরা বড় হয়েছিলেন মাটির সোঁদা গন্ধে। তাঁদের ঘর ছিল মাটির, আর খেলনা ছিল প্রকৃতির অবারিত দান। গাছের শুকনো ডাল দিয়ে বানানো তীর-ধনুক, কলাপাতার ভেলা, কিংবা বর্ষার দিনে উঠানে ভাসানো কাগজের নৌকা। অথচ দেখুন, সেই সেকেলে শৈশব থেকে উঠে এসেই তাঁরা হয়েছেন জাঁদরেল ডাক্তার, তুখোড় ইঞ্জিনিয়ার, আজীবন লড়াকু শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী।
আমি নিজের কথাই বলি। আমার শৈশবও তো কেটেছে টিনের চালের নিচে বৃষ্টির শব্দ শুনে। আমার খেলনার তালিকায় কোনো সেন্সরি বোর্ড ছিল না। ছিল মাটির ব্যাংক, টেপ দিয়ে প্যাঁচানো টেনিস বল আর পুরনো ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে বানানো ঘুড়ি। আলহামদুলিল্লাহ, আজ সেই আমিই আপনাদের সামনে এই লেখাটি লিখছি।
সর্বকালের সেরা মেধাবীদের একজন, আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর মেধার বিকাশের পেছনে কোনো ৫ হাজার টাকার লার্নিং কিট ছিল না। ছিল তাঁর বাবার দেওয়া সাধারণ একটা কম্পাস। ওই একটা কম্পাসের নড়াচড়া দেখেই তাঁর মনে মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে কৌতূহল জেগেছিল।
সবচেয়ে বড় পরিহাসটা কোথায় জানেন? যে মারিয়া মন্টেসরির নাম ভাঙিয়ে আজ হাজার হাজার কোটি টাকার বিজনেস সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, সেই নারী কিন্তু তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি শুরু করেছিলেন ইতালির একেবারে দরিদ্র আর অবহেলিত শিশুদের নিয়ে। যাদের ঘরে দামি খেলনা তো দূরে থাক, ঠিকমতো দু'বেলা খাবারও জুটত না।
যে পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করা হয়েছিল স্রেফ অভাবী শিশুদের মেধা বিকাশের জন্য, আজ সেই পদ্ধতিরই ব্রান্ডিং করা হচ্ছে আপনার পকেট থেকে হাজার হাজার টাকা খসানোর জন্য। কী অদ্ভুত পরিহাস, তাই না? যে জ্ঞান ছিল মুক্ত, তাকেই আজ শিকলে বেঁধে প্রিমিয়াম প্যাকেজ হিসেবে আপনার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
তাহলে মনে মনে ভাবুন তো, সেই যুগের শিশুদের ব্রেইন কি তবে বিকশিত হয়নি? তাঁরা কি পিছিয়ে ছিলেন? তাঁরা যদি স্রেফ ধুলোবালি, কাদা আর লাঠিসোঁটা দিয়ে খেলে বিশ্ব জয় করতে পারেন, তবে আজ কেন আপনাকে মগজ ধোলাই করে বোঝানো হচ্ছে যে আপনার বাচ্চার ব্রেইন
ডেভেলপমেন্টের চাবিকাঠি ওই রঙিন প্লাস্টিকের বাক্সে বন্দি?
কেন আপনাকে বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে, ৫ হাজার টাকার সর্টিং কিট না থাকলে আপনার বাচ্চা রং চিনবে না?
আসলে সমস্যাটা খেলনায় নয়, সমস্যাটা আমাদের ভাবনায়। আমরা বস্তুর চাকচিক্য দিয়ে মেধার পরিমাপ করতে শুরু করেছি। কিন্তু সত্যটা হলো, আপনার বাচ্চার মগজ কোনো দামি খেলনার প্লাস্টিক চিবিয়ে বড় হয় না।
তাহলে সেই রহস্যটা কী? কীভাবে একজন শিশু কোনো দামি উপকরণ ছাড়াই প্রতিভাশীল হয়ে ওঠে?
এই রহস্যের জট আমি একটু পরেই খুলছি। তবে তার আগে, চলুন আমাদের ব্রেইনের আসল ক্ষুধাটা নিয়ে একটু কথা বলি।
তৃতীয় সত্য: আপনার সন্তানের ব্রেইনের আসলে কী দরকার?
চলুন, এবার চটকদার বিজ্ঞাপনের জগত ছেড়ে একটু বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি থেকে ঘুরে আসি। নিউরোসায়েন্স আসলে কী বলে?
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড দীর্ঘ বিশ বছর ধরে একটা গবেষণা চালিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, শিশুর মগজ আসলে কীভাবে বিকশিত হয়? বিশ বছর পর তারা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তা শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। তারা বলেছে, শিশুর ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অপরিহার্য জিনিসটি কোনো খেলনা নয় বরং মানুষের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন। বিশেষ করে বাবা-মায়ের সাথে কাটানো সময়।
বিজ্ঞানের ভাষায় এর একটা চমৎকার নাম আছে Serve and Return Interaction.
ব্যাপারটা ঠিক টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলার মতো। শিশু যখন আপনার দিকে তাকিয়ে হাসে (সে সার্ভ করল), আপনিও প্রতিউত্তরে হাসলেন (আপনি রিটার্ন করলেন)। শিশু যখন আধো-আধো বোলে "মা-মা" বলে ডাকল, আপনিও সাড়া দিলেন। শিশু যখন কৌতূহলে হাত বাড়ালো, আপনিও তাকে স্পর্শ করলেন।
শুনে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে? কিন্তু অবাক করা সত্য হলো, আপনার এই অতি সাধারণ আদান-প্রদানের মুহূর্তগুলোতেই শিশুর মগজে প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে লাখ লাখ নিউরাল কানেকশন! কোনো দামী প্লাস্টিকের খেলনা এই মিরাকল
ঘটাতে পারে না। কোনো ব্যাটারিচালিত রোবট আপনার সন্তানের মগজে এই সংকেত পাঠাতে পারে না।
আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের একটি রিপোর্ট দেখুন। তারা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছরে আপনি তার সাথে যত বেশি কথা বলবেন, তার শব্দভাণ্ডার তত বেশি সমৃদ্ধ হবে।
লক্ষ করুন, এখানে কিন্তু তারা কোনো স্মার্ট টয় বা দামি খেলনার কথা বলেনি। তারা বলেছে, কথা বলার কথা।
চলুন একটা বাস্তব উদাহরণ দেই। ধরুন, আপনি রান্নাঘরে রান্না করছেন। আপনার দুই বছরের ছোট্ট সন্তানটি পাশে বসে আছে। এখন আপনি তাকে আনন্দ দিতে ৫ হাজার টাকার একটা 'ইলেকট্রনিক লার্নিং প্যাড' হাতে দিয়ে দিতে পারেন। অথবা, আপনি যা করছেন তা-ই তার সাথে শেয়ার করতে পারেন।
আপনি বলতে পারেন, দেখো বাবা, আম্মু এখন পেঁয়াজ কাটছে। দেখেছো? পেঁয়াজ কাটলে কেমন চোখ দিয়ে পানি পড়ে! এবার আম্মু কড়াইয়ে তেল দিচ্ছি। শুনতে পাচ্ছো? চট্ চট্ কেমন আওয়াজ হচ্ছে! এবার দেব মসলা। এই দেখো হলুদ গুঁড়ো, এটা ধনিয়া...
ব্যাস! আপনার এই সাধারণ কথোপকথনেই আপনার সন্তান
একসাথে চার-পাঁচটা দামি কোর্সের পড়া শিখে ফেলল:
• নতুন শব্দ: পেঁয়াজ, তেল, মসলা।
• কার্যকারণ (Cause and Effect): পেঁয়াজ কাটলে চোখে পানি আসে।
• সিকোয়েন্সিং: আগে তেল দিতে হয়, তারপর মসলা।
• পঞ্চেন্দ্রিয়: সে দেখছে, শুনছে এবং ঘ্রাণ নিচ্ছে।
একটু ভাবুন তো, এই অভিজ্ঞতার জন্য কি আপনার কোনো দামী সেন্সরি কিট লেগেছে? লাগেনি। আপনার পকেটে ১০ হাজার টাকা থাকুক বা না থাকুক, আপনার কণ্ঠস্বর, আপনার গল্প আর আপনার সাহচর্যই হলো আপনার বাচ্চার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এডুকেশনাল টুল।
আমরা কি তবে আমাদের ঘরে থাকা এই অমূল্য সম্পদগুলোকে অবহেলা করে বাজারের প্লাস্টিকের পেছনে ছুটছি না?
চতুর্থ সত্য: আপনার ঘরেই আছে হাজারো শিক্ষার উপকরণ
সম্মানিত অভিভাবক, আমরা আসলে মরীচিকার পেছনে ছুটছি। আমরা ভাবি, হাজার টাকার প্লাস্টিকের মোড়কের খেলনা কিনে না দিলে এই যুগে বোধহয় শিক্ষা হয় না। অথচ
একবার চোখ মেলে তাকান তো! আপনার চারপাশেই ছড়িয়ে আছে ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের হাজারো উপকরণ। আপনি যেগুলোকে সংসারের আবর্জনা বা রান্নাঘরের জিনিস মনে করছেন, নিউরোসায়েন্সের ভাষায় সেগুলোই হলো শ্রেষ্ঠ লার্নিং টুল।
রান্নাঘরের গুপ্তধন:
ভাবুন তো, আপনি যে হাজার টাকা দিয়ে স্ট্যাকিং কাপ বা সাইজ সর্টিং টয় কেনার জন্য আফসোস করছেন, আপনার রান্নাঘরেই কি বিভিন্ন মাপের গামলা, বাটি আর পাতিল নেই?
আপনার শিশু যখন একটা ছোট বাটি বড় বাটির ভেতরে ঢোকায়, তখন সে আসলে Spatial Awareness বা স্থানের ধারণা শিখছে। সে শিখছে কোনটা বড়, কোনটা ছোট। সে শিখছে ভেতর আর বাহির।
একটা প্লাস্টিকের চামচ আর একটা স্টিলের কাপ। ব্যাস! তার Hand-eye coordination বা হাত-চোখের সমন্বয়ের জন্য এর চেয়ে দামি জিনিস আর কী হতে পারে?
আর ডাল-চালের কথা চিন্তা করুন তো। এক মুঠো মসুর ডাল আর এক মুঠো চাল মিশিয়ে দিন। তারপর তাকে বলুন আলাদা করতে। এই যে সে দুই আঙুলের ডগা ব্যবহার করে
একটা একটা করে ডাল তুলছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে Fine Motor Skill Development। যেটার জন্য মানুষ হাজার টাকার সেন্সরি বিন কিনে, সেটা আপনার ঘরের এক মুঠো চালেই সম্ভব। লাল টমেটো, সবুজ শসা আর হলুদ কলার চেয়ে জীবন্ত উপায়ে কেউ কি রঙ চিনতে পারে?
পরিত্যক্ত জিনিস
সম্মানিত অভিভাবক, আমরা অনেকেই অনলাইন শপগুলোতে স্ক্রল করে করে দামী অ্যাক্টিভিটি বোর্ড খুঁজি। ভাবি, ওই বোর্ডে যত বেশি গিট আর নব (Knob) থাকবে, বাচ্চা বোধহয় তত বেশি স্মার্ট হবে। অথচ আপনার ঘরে পড়ে থাকা একটা পুরনো খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন, যেটা ছিঁড়লে আপনি হয়তো বাচ্চাকে বকা দেন, সেটা কি কোনো অংশে কম?
শিশুকে ওই কাগজটা ছিঁড়তে দিন। যখন সে কাগজটা দুই হাত দিয়ে ছিঁড়ছে, তখন তার আঙুলের সূক্ষ্ম পেশিগুলো কাজ করছে। কাগজ কুঁচকানোর শব্দ তার কানে নতুন এক সংকেত দিচ্ছে। ছবিগুলো দেখে সে যখন অদ্ভুত সব প্রশ্ন করছে, তখন তার কল্পনার রাজ্যে ডালপালা গজাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, এই সাধারণ কাগজের টুকরোর মধ্যে যে মানসিক তৃপ্তি আর সৃজনশীলতা আছে, তা হাজার টাকার কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনে নেই। স্ক্রিন আপনার বাচ্চাকে 'প্যাসিভ' করে দেয়, আর কাগজ তাকে করে তোলে 'অ্যাক্টিভ'।
আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল। তার সন্তানের জন্য সে অনেক দামি একটা ইলেকট্রিক গাড়ি কিনেছিল। কিন্তু সেই শিশুটি সারাদিন খেলত একটা পুরনো কার্টনের বাক্স নিয়ে! ওই বাক্সটাই কখনো তার কাছে স্পেসশিপ, কখনো আবার তার ছোট্ট ঘর। এই যে Imagination বা কল্পনাশক্তি, এটা কি কোনো ব্যাটারিচালিত খেলনা দিতে পারে? ব্যাটারিচালিত খেলনা তো শিশুর কল্পনাকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে ফেলে। কিন্তু একটা খালি বাক্স তাকে অসীম আকাশের স্বপ্ন দেখায়।
বাসার অন্যান্য জিনিস:
সম্মানিত অভিভাবক, আপনি বাসার সহজ আরো কিছু ইনস্ট্রুমেন্টস দিয়েও কিন্তু তাদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে সাহায্য করতে পারেন। একটু ভাবুন তো...
• একটি ৫০ টাকার গল্প/ছড়ার বই বা একটা ছবির বই, হাজার টাকার প্লাস্টিকের খেলনার চেয়ে বেশি কার্যকর। এটা বাচ্চার মনে পড়ার প্রতি আগ্রহ আর ভাষার ভিত গড়ে দেয়।
• আপনার পাঞ্জাবির বোতাম বা পুরনো শার্টের বোতাম খোলা-লাগানো, এটি শিশুর Fine Motor Skill ডেভেলপমেন্টের জন্য যেকোনো থেরাপিউটিক টুলের
চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
• দুটো চেয়ারের মাঝখানে একটা কম্বল টানিয়ে দিন, নিচে কয়েকটা বালিশ দিন। দেখুন, একটা 'গুহা' বা 'ক্যাসেল' তৈরি হয়ে গেল! এর ভেতরে বসে যখন আপনার শিশু লুকোচুরি খেলবে, তখন তার ভেতরে যে স্পেশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তৈরি হবে, তা কোনো দামী গেম দিয়ে সম্ভব নয়।
তাই বলছি, দামী খেলনা দিয়ে শিশুর ঘর সাজানো যায়, কিন্তু পরিত্যক্ত সাধারণ জিনিস দিয়ে শিশুর মস্তিষ্ক সাজানো যায়। আপনি কি এখনো মরীচিকার পেছনে ছুটবেন, নাকি আপনার ঘরের এই ছোট ছোট জাদুকরী জিনিসগুলো আপনার সন্তানের হাতে তুলে দিবেন?
প্রকৃতির বিশাল উপহার:
সম্মানিত অভিভাবক, চলুন এবার ড্রয়িং রুমের দেয়াল ছাপিয়ে একটু বাইরের জগতের দিকে তাকাই। আমরা কৃত্রিমভাবে তৈরি সেন্সরি কিট বা ওয়াটার প্লে সেট কেনার জন্য যখন উদগ্রীব হয়ে থাকি, তখন ভুলেই যাই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা এই পুরো প্রকৃতিকেই সাজিয়েছেন আপনার সন্তানের এক বিশাল পাঠশালা হিসেবে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, সন্তানকে বাইরের ধুলোবালি বা
কাদা থেকে দূরে রাখলেই বোধহয় সে সুস্থ আর উন্নত থাকবে। কিন্তু নিউরোসায়েন্স আর শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। আপনি কি জানেন? প্রকৃতির এই সাধারণ জিনিসগুলো আপনার সন্তানের মস্তিষ্কে যে সিগন্যাল পাঠায়, তা কোনো এয়ারকন্ডিশন্ড শোরুমের খেলনা পাঠাতে পারে না।
পাতা ও ফুলের জাদুকরী জগত:
আমরা রঙের ধারণা দেওয়ার জন্য হাজার টাকার কালার কার্ড কিনি। অথচ একবার আপনার আঙিনায় বা পার্কে নিয়ে যান তো তাকে। সেখানে সবুজ পাতা আছে, মরা বাদামি পাতা আছে, ঝরে পড়া হলুদ পাতা আছে। এই যে রঙের শেড (Shade) আর ভিন্ন ভিন্ন টেক্সচার, কোনোটা খসখসে, কোনটা রেশমের মতো নরম। এগুলো স্পর্শ করার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কে যে Tactile Sensory বা স্পর্শজনিত উদ্দীপনা তৈরি হয়, তা অদ্বিতীয়। একটি ফুলের গন্ধ শুঁকে যখন সে চোখ বন্ধ করে আনন্দ পায়, তখন তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় যে পাঠ নেয়, তা কোনো বই পড়িয়ে সম্ভব নয়।
পাথর ও নুড়ির গণিত:
গণিত মানে কি শুধু কাগজের পাতায় যোগ-বিয়োগ? একদমই না। এক মুঠো নুড়ি পাথর আপনার বাচ্চার জন্য শ্রেষ্ঠ ম্যাথমেটিক্যাল টুল। কয়েকটা বড় পাথর আর কয়েকটা ছোট নুড়ি নিন। তাকে বলুন বড়-ছোট আলাদা করতে। তাকে
শেখান, দেখো তো বাবা, এখানে কয়টা পাথর আছে? সে যখন গুনবে এক, দুই, তিন... তখন সে বাস্তব বস্তুর মাধ্যমে সংখ্যাকে অনুভব করছে। সাজানো শিখছে, প্যাটার্ন শিখছে।
মাটি: সম্মানিত অভিভাবক, আমরা ভয় পাই, মাটি ধরলে বাচ্চা অসুস্থ হবে। অথচ আপনি কি জানেন? মাটিতে থাকা কিছু উপকারী অণুজীব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। মাটি দিয়ে ঘর বানানো, কাদা দিয়ে গোল গোল পুতুল বানানো, এর চেয়ে বড় Sensory Play আর কী হতে পারে? এই যে কাদা হাতে চটচট করছে, মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে আসছে, এটি তার মগজের নিউরাল কানেকশন গুলোকে এক নিমেষে সচল করে দেয়। অথচ আমরা এই মাটির অভাব পূরণ করতে কাইনেটিক স্যান্ড (Kinetic Sand) কিনি চড়া দামে। কী অদ্ভুত, তাই না?
পানি:
এক গামলা পানি আর কয়েকটা ভাঙা কাপ বা বাটি।সম্মানিত অভিভাবক, বিশ্বাস করুন, আপনার বাচ্চার জন্য এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ওয়াটার সায়েন্স ল্যাব হয়ে উঠতে পারে।
সে যখন কাপে পানি ভরে আবার ঢেলে দেয়, তখন সে ভরা-খালি শিখছে। সে যখন দেখে একটা কাঠের টুকরো ভাসছে আর একটা চামচ ডুবে যাচ্ছে, তখন সে নিজের অজান্তেই পদার্থবিজ্ঞানের Density বা ঘনত্বের পাঠ নিচ্ছে।
এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, দামী প্লাস্টিকের তৈরি সেন্সরি ওয়াটার টেবল কি এই অকৃত্রিম অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি কার্যকর? কখনোই না। প্রকৃতি নিখরচায় আপনার সন্তানকে যা শেখাতে পারে, দামী কর্পোরেট কোম্পানিগুলো তার ছিটেফোঁটাও পারবে না। (অবশ্যই পানির বিষয়ে সতর্ক থাকবেন)
সম্মানিত অভিভাবক, আপনার বাচ্চার শৈশবকে প্লাস্টিকের খাঁচায় বন্দি করবেন না। তাকে মাটির কাছে নিন, তাকে পানির স্পর্শ পেতে দিন, তাকে নুড়ি পাথর দিয়ে বিশ্ব জয়ের সুযোগ করে দিন। কারণ, প্রকৃতির এই উপহারগুলোই তার মস্তিষ্কের প্রকৃত খাদ্য।
পঞ্চম সত্য: আপনার সময়ই সবচেয়ে দামি উপহার
সম্মানিত অভিভাবক, এবার আমি এমন একটি সত্যের সামনে আপনাকে দাঁড় করাব, যা শোনার পর আপনার বুকের ওপর চেপে থাকা সব অপরাধবোধের পাহাড় এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমরা টাকার পেছনে ছুটি যাতে সন্তানকে সেরা জিনিসটা দিতে পারি, অথচ সেই সেরা জিনিসটা যে আসলে কোনো দোকানে বিক্রিই হয় না, সেটা কি আমরা জানি?
চলুন আজ একটি গবেষণার গল্প শুনি। দুটি ভিন্ন পরিবেশের শিশুদের নিয়ে একটি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। ফলাফলটা আমাদের সবার জন্য এক বিশাল চপেটাঘাত।
প্রথম গ্রুপে ছিল সেইসব শিশু, যাদের ঘরে দামী খেলনার কোনো অভাব নেই। বাহারি রঙের লার্নিং কিট, ব্যাটারিচালিত রোবট আর ব্রান্ডেড সব ম্যাটেরিয়াল। কিন্তু সমস্যা ছিল এক জায়গায়, তাদের বাবা-মা ভীষণ ব্যস্ত। সন্তানের সাথে কথা বলার বা খেলার সময় তাদের খুব একটা নেই। তারা ভাবতেন, দামী খেলনা তো কিনে দিয়েছিই, ওটা থেকেই তো ও সব শিখবে।
দ্বিতীয় গ্রুপে ছিল সেইসব শিশু, যাদের ঘরে তেমন কোনো দামী খেলনা ছিল না। তাদের সম্বল ছিল ঘরোয়া সাধারণ কিছু জিনিস। কিন্তু তাদের ছিল একটা অভাবনীয় সম্পদ, বাবা-মায়ের নিবিড় সান্নিধ্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বাবা-মা ফোন দূরে সরিয়ে রেখে তাদের সাথে কথা বলতেন, গল্প শোনাতেন, এমনকি নিছক ধুলোবালি নিয়ে তাদের সাথে খেলতেন।
ফলাফল কী ছিল জানেন?
গবেষণা শেষে দেখা গেল, দ্বিতীয় গ্রুপের শিশুরা অর্থাৎ যারা শুধু সময় আর ভালোবাসা পেয়েছে, তারা বুদ্ধিবৃত্তি (IQ),
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ) এবং সামাজিক দক্ষতার দিক থেকে প্রথম গ্রুপের শিশুদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে! (এটা অনেক গবেষণার একটা সার নির্জাস)
কারণটা খুব সহজ: মানুষের স্পর্শ, ভালোবাসা আর পূর্ণ মনোযোগের কোনো কৃত্রিম বিকল্প আজ পর্যন্ত কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি। কোনো প্লাস্টিকের রোবট আপনার সন্তানের চোখের ভাষা বুঝতে পারে না, কিন্তু আপনি পারেন। কোনো দামী স্পিকার আপনার সন্তানের আবেগে সাড়া দিতে পারে না, কিন্তু আপনার কোল পারে।
সম্মানিত অভিভাবক, আপনার কাছে আমার একটি বিনীত অনুরোধ। আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দিনে মাত্র ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করুন। মাত্র ৩০ মিনিট! এই সময়টুকুতে ফোনটা অন্য ঘরে রেখে দিন, ওয়াইফাই বন্ধ করুন। শুধু আপনি আর আপনার সন্তান। তার চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, তাকে ছড়া শোনান, তার আজব সব কাল্পনিক গল্পের সঙ্গী হোন।
বিশ্বাস করুন, আপনার এই ৩০ মিনিটের সান্নিধ্য, মার্কেটের ওই ১০ হাজার টাকার 'স্মার্ট লার্নিং টয়'-এর চেয়েও কোটি গুণ বেশি কার্যকর। আপনার বাচ্চার মগজে যে নিউরাল কানেকশন আপনার একটা চুমু বা একটা হাসিতে তৈরি হবে, তা কোনো যান্ত্রিক খেলনা হাজার বছরেও পারবে না।
আমরা সন্তানদের জিনিস দিচ্ছি, কিন্তু নিজেকে দিচ্ছি না। অথচ তারা জিনিস চায় না, তারা চায় আপনাকে। আপনিই কি তবে আপনার সন্তানের শ্রেষ্ঠ উপহার নন?
ষষ্ঠ সত্য: আপনিই সবচেয়ে বড় ইন্সট্রুমেন্ট
সম্মানিত অভিভাবক, এবার আমি আপনাকে এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করাব, যেখানে তাকালে আপনি আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী কারিগরকে দেখতে পাবেন। সেই কারিগরটি কোনো কোম্পানি নয়, কোনো রোবট নয়, সেই কারিগরটি স্বয়ং আপনি।
জি, আপনি!
আমরা সারা দুনিয়া চষে বেড়াই সেরা ইন্সট্রুমেন্ট বা শিক্ষা সরঞ্জামের খোঁজে। অথচ আমরা ভুলে যাই, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এমন কিছু ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন, যা পৃথিবীর কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা
অসম্ভব।
সম্মানিত অভিভাবক, আপনার সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের জন্য আপনিই হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর লিভিং ইন্সট্রুমেন্ট। আপনার ভেতরে আল্লাহ তা'আলা এমন পাঁচটি সফটওয়্যার দিয়ে দিয়েছেন, যার কোনো বিকল্প আজ অবধি তৈরি হয়নি।
১. আপনার কণ্ঠস্বর: আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে মিউজিক্যাল টয় বা অডিও বুক কিনি। অথচ আপনার কণ্ঠস্বরের যে ফ্রিকোয়েন্সি, তা আপনার সন্তানের হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে মিশে থাকে সেই মাতৃগর্ভ থেকে।
যখন আপনি তাকে কোলে নিয়ে সুমধুর স্বরে কুরআন তিলাওয়াত শোনান, তখন সেই ধ্বনি তার মস্তিষ্কের কোষগুলোকে যেভাবে প্রশান্ত করে, কোনো ডিজিটাল স্পিকার তা পারে না। যখন আপনি তাকে ছড়া শোনান বা গল্প বলেন, আপনার গলার স্বরের ওঠা-নামা দেখে সে শিখছে আবেগ, ভাষা আর প্রকাশভঙ্গি। আপনার কণ্ঠই তাকে শেখায় সে নিরাপদ।
২. আপনার স্পর্শ: নিউরোসায়েন্সে স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্ট বা স্পর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনি যখন আপনার সন্তানকে একটি আদরমাখা চুমু দেন, তাকে শক্ত করে আলিঙ্গন (Hugging) করেন, তখন তার শরীরে অক্সিটোসিন নামক
হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি তার মস্তিষ্কের ভয় দূর করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
কোনো দামী খেলনা কি আপনার সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারবে, ভয় নেই বাবা, আমি তো আছি? পারবে না।
আপনার এই স্পর্শই তাকে এমন এক মানসিক নিরাপত্তা দেয়, যা তাকে ভবিষ্যতে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সাহস জোগাবে। আপনার কোলটাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্গ।
৩. আপনার সময়: সম্মানিত অভিভাবক, একটু ভাবুন তো, শিশু যখন একটি খেলনা নিয়ে খেলে, সে শুধু খেলনাটার সাথেই কথা বলে। কিন্তু যখন সে আপনার সাথে খেলে, তখন সেখানে একটা টু-ওয়ে ট্রাফিক তৈরি হয়।
আপনি তার হাসিতে হাসছেন, তার প্রশ্নে উত্তর দিচ্ছেন। আপনার এই সময়টুকুই তার ব্রেইনে লাখ লাখ নিউরাল কানেকশন তৈরি করছে। আপনার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক একটি ইট।
৪. আপনার উপস্থিতি: আজকাল অনেক বাবা-মা সন্তানের পাশে বসে থাকেন ঠিকই, কিন্তু তাদের চোখ থাকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। এটাকে বলে অ্যাবসেন্ট প্রেজেন্স।
কিন্তু আপনার সন্তান যখন দেখে আপনি ফোন সরিয়ে রেখে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তখন তার মনে একটি বার্তা যায়, আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এই যে নিজের মূল্য বুঝতে পারা, এটাই হলো Self-esteem বা আত্মমর্যাদার ভিত্তি। কোনো দামী সেন্সরি টয় আপনার সন্তানকে এই মর্যাদা দিতে পারবে না।
৫. আপনার দো'আ: সবশেষে যে ইন্সট্রুমেন্টের কথা বলব, তা কোনো বাজারজাতকৃত পণ্য নয়। তা হলো আপনার দো'আ। একজোড়া চোখের পানি আর আরশের মালিকের কাছে তুলে ধরা দুটি হাত, এটাই আপনার সন্তানের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল।
আপনি যখন রাতে তার কপালে হাত রেখে তিলাওয়াত করেন আর আল্লাহর কাছে তার হিফাজতের জন্য কান্নাকাটি করেন, তখন সেই দো'আর বরকতে তার চারপাশে এক অদৃশ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়। কোনো খেলনা, কোনো টেকনোলজি এই আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।
সম্মানিত অভিভাবক, বাজারের প্লাস্টিক আপনার বাচ্চার হাত ব্যস্ত রাখতে পারে, কিন্তু আপনার কণ্ঠ, স্পর্শ, সময়, উপস্থিতি আর দো'আ তার আত্মা এবং মস্তিষ্ক গঠন করে।
আপনার পকেটে ১০ হাজার টাকা নেই বলে আপনি নিজেকে ছোট ভাববেন না। কারণ, আল্লাহ আপনাকে এমন সব ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে পাঠিয়েছেন যা কিনতে কোটিপতিরাও হিমশিম খাবে।
সম্মানিত অভিভাবক, বাজারের ওই ১৪ লাখ কোটি টাকার সিন্ডিকেট আপনাকে স্রেফ একজন ক্রেতা বানাতে চায়। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে পাঠিয়েছেন একজন কারিগর হিসেবে।আপনিই আপনার সন্তানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। এখন সিদ্ধান্ত আপনার,আপনি কি বাইরের প্লাস্টিকের ওপর ভরসা করবেন, নাকি নিজের ভেতরের এই স্বর্গীয় ক্ষমতাগুলোকে কাজে লাগাবেন?
সপ্তম সত্য: ইসলাম যা শেখায়
সম্মানিত অভিভাবক, এবার চলুন আমরা আমাদের শেকড়ের দিকে তাকাই। আমরা যখন পশ্চিমা গবেষণাপত্র আর আধুনিক তথাকথিত এক্সপার্ট'দের থিওরি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, তখন আমরা ভুলেই গেছি যে চৌদ্দশ বছর আগেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন সন্তান লালন-পালনের আসল মূলমন্ত্র।
আমরা আজ চাইল্ড সাইকোলজি শিখতে ইউরোপ-আমেরিকার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। অথচ আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে
কেমন ছিলেন? তাঁর সেই আচরণগুলো কি কোনো দামী খেলনার ওপর নির্ভর ছিল?
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে দেখা হলে কোলে নিতেন। তাদের সাথে খেলতেন, তাদের কপালে পরম মমতায় চুমু খেতেন। একবার এক বেদুইন এসে দেখলেন রাসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিশুদের (হাসান-হোসাইন) চুমু খাচ্ছেন। সে অবাক হয়ে বলল, আপনি কি শিশুদের চুমু খান? আমার দশটি সন্তান, আমি কাউকেই কোনোদিন চুমু খাইনি!
রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া ছিনিয়ে নেন, তবে আমার কী করার আছে? (সহীহ বুখারী)।
লক্ষ করুন, এখানে কোনো স্মার্ট টয় বা ডেভেলপমেন্ট কিট নেই; আছে দয়া, মায়া আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। এটাই ছিল তাঁদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের শ্রেষ্ঠ জ্বালানি।
একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সলাত পড়ছেন। সিজদায় গেছেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর কলিজার টুকরো নাতি হাসান বা হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে চড়ে বসলেন।
তিনি কী করলেন? বিরক্তি প্রকাশ করলেন? না!
তিনি তাঁর সিজদাকে দীর্ঘ করলেন। ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা তুললেন না, যতক্ষণ না তারা নিজে থেকে পিঠ থেকে নামল।
তিনি সলাত দীর্ঘ করেছিলেন যাতে একটি শিশুর খেলার আনন্দ অপূর্ণ না থাকে। ভাবুন একবার, যিনি মহাবিশ্বের রবের সাথে কথোপকথনে মগ্ন, তিনিও একটি শিশুর মানসিক তৃপ্তিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন! এর জন্য কি কোনো ১০ হাজার টাকার প্লে-জোন লেগেছিল?
আমাদের পূর্বসূরি বা সালাফরা যখন সন্তানদের গড়ে তুলতেন, তখন তাঁদের সামনে কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন ছিল না। ছিল না কোনো ব্রেইন বুস্টার খেলনার প্রলোভন। তাঁরা সন্তানদের ব্যক্তিত্বের ইমারত তৈরি করতেন চারটি অটল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে:
• আল্লাহর ভয়: যা তাদের সৎ বানাত।
• কুরআন তিলাওয়াত: যা তাদের দ্বীনকে বুঝতে শেখাত। তাছাড়া এই তিলাওয়াত তাদের স্মৃতিশক্তি আর বুদ্ধিবৃত্তিকে শাণিত করত।
• সৎ চরিত্র: যা তাদের মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দিত।
• পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ: যা তাদের পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলত।
সম্মানিত অভিভাবক, একটু ভাবুন তো, এই যে ইতিহাসের পাতায় পাতায় সোনালী নক্ষত্রের মতো জ্বলে থাকা মানুষগুলো তাঁরা কি কোনো মন্টেসরি ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে বড় হয়েছিলেন? কোনো দামী প্লাস্টিকের খেলনা কি তাঁদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছিল?
কখনোই না! তবুও কি তাঁদের মেধা আজ বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে না? অবশ্যই করে।
কারণ তাঁরা এমন কিছু পেয়েছিলেন যা আজ আমাদের সন্তানদের ঘর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা পেয়েছিলেন বাবা-মায়ের নিবিড় সময়, নির্মল ভালোবাসা আর এক অনন্য দ্বীনি তারবিয়াহ। তাঁরা জানতেন, শিশুর কচি মগজের জন্য রঙিন প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি জরুরি হলো, নিরাপত্তা, মনোযোগ আর সঠিক আদর্শ।
আজকের ট্র্যাজেডিটা কোথায় জানেন?
আপনি হয়তো আপনার সন্তানকে ৫ হাজার টাকার খেলনা কিনে দিয়ে বা তার হাতে একটি দামী ট্যাবলেট ধরিয়ে দিয়ে ভাবছেন, আমি একজন দায়িত্বশীল আধুনিক বাবা-মা! সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপ করতে আমি দামি দামি ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করছি অথচ পর্দার আড়ালে আপনি তাকে সেই অকৃত্রিম মায়া আর সঠিক পথনির্দেশনা থেকেই বঞ্চিত
করছেন, যা তাকে আসলে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলত। আপনি তাকে জিনিস দিচ্ছেন, কিন্তু নিজের সময় আর আদর্শ দিচ্ছেন না।
আমি আবারও পরিষ্কার করে বলছি, খেলনা দেওয়া যাবে না, আমি তা বলছি না। সামর্থ্য থাকলে দিবেন। কিন্তু আমি বলতে চাইছি, দামী খেলনা ছাড়া ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট থেমে থাকবে, এই মিথ্যাটা বিশ্বাস করবেন না। আপনার হাতের কাছে থাকা অতি সাধারণ জিনিস আর আপনার আন্তরিক সাহচর্যই আপনার সন্তানকে অনন্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।
আপনার অভাবটা দামী খেলনার নয়; আপনার অভাবটা হলো, সন্তানকে কোলে নেওয়ার, তাকে ঘিরে বড় কোনো স্বপ্ন দেখার আর তার জন্য আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলার।
অষ্টম সত্য: তুলনা থেকে বের হোন
সম্মানিত অভিভাবক, এবার আমি আপনার মনের সেই বিষফোঁড়াটি নিয়ে কথা বলব, যা আপনাকে প্রতি রাতে কুরে কুরে খায়। তার নাম তুলনা। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে আমাদের সুখ-দুঃখের রিমোট কন্ট্রোল চলে গেছে অন্যের ফেসবুক স্ট্যাটাস বা ইন্সটাগ্রাম রিলের হাতে।
ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রাম খুললেই আপনি দেখেন, চমৎকার সাজানো-গোছানো একটি ঘর, দামি খেলনার পাহাড়, আর
তার মাঝে বসে থাকা একটি পারফেক্ট শিশু। সেই ছবি দেখে আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আপনার মনে হয়, আপনার জীবনটা কত অপূর্ণ! আপনার বাচ্চার তো এতো দামি খেলনা নেই, আপনার ঘর তো এমন রাজকীয় নয়!
কিন্তু থামুন! পর্দার আড়ালের সত্যটা কি আপনি জানেন?
সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি যা দেখেন, সেটা মানুষের পুরো জীবনের মাত্র ১% অর্থাৎ তাদের সেরা মুহূর্ত। কেউ ১৫টি নতুন মন্টাসরি খেলনার ছবি পোস্ট করেছে? আপনি তো শুধু সেই স্থির চিত্রটিই দেখছেন। আপনি কি জানেন, হয়তো সেই খেলনাগুলো সাজিয়ে ছবি তোলার পরেই শিশুটিকে একা ফেলে রাখা হয়, আর সে বাকিটা সময় স্ক্রিনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে?
কেউ হয়তো একটি ঝকঝকে প্লে-রুমের ছবি দিয়েছে। কিন্তু সেই পারফেক্ট ছবির পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে এমন এক বাবা-মা, যারা সারাদিন ক্যারিয়ার আর স্ট্যাটাস নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, সন্তানের চোখের ভাষা পড়ার মতো অবসর তাদের নেই। দামী খেলনা হয়তো আছে, কিন্তু সেখানে প্রাণের স্পন্দন নেই।
সম্মানিত অভিভাবক, একটি চিরন্তন সত্য মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, সেই সীমার মধ্যে থেকে আপনার সেরাটা দেওয়াই আপনার একমাত্র দায়িত্ব। কার
ঘরে ৫টি রোবট আছে, কার কতটি টয় আছে, কার কতটি এডুকেশনাল ইনস্ট্রুমেন্টস আছে আর আপনার ঘরে কেন নেই এই হিসাব আপনার কাছে চাওয়া হবে না।
কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এক অভাবনীয় সান্ত্বনা দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। (সূরা বাকারা: ২৮৬)
আল্লাহ জানেন আপনার পকেটে কত টাকা আছে। তিনি জানেন আপনি দুই বেলা ডাল-ভাত জোগাড় করতে কতটা ঘাম ঝরান। তাই তিনি আপনার কাছে দামী মন্টেসরি খেলনা দাবি করেন না। তিনি দেখেন, আপনার পকেটে দামী খেলনার টাকা না থাকলেও, আপনার হৃদয়ে তার দেয়া আমনতের (সন্তান) জন্য কতটা হাহাকার আছে।
আমি আপনাকে কিছু চেকপয়েন্ট দিচ্ছি। সেগুলো মেলান তো আপনার সাথে:
১. আপনি কি আপনার সন্তানকে মন উজাড় করে ভালোবাসা দিতে পারছেন?
২. আপনি কি দিনের শেষে ক্লান্ত হয়েও তাকে একটু সময় দিচ্ছেন?
৩. আপনি কি সিজদায় গিয়ে তার জন্য চোখের পানি ফেলে দো'আ করছেন?
৪. আপনি কি তাকে মিথ্যে না বলা আর মানুষের মতো মানুষ হওয়ার তারবিয়াহ দিচ্ছেন?
যদি এই উত্তরগুলো হ্যাঁ হয়, তবে আমি আপনাকে বলছি, আপনিই পৃথিবীর চমৎকার এবং সফলতম বাবা-মা।
আপনার পকেটে ৫ হাজার টাকা না থাকাটা কোনো ব্যর্থতা নয়; আপনার ব্যর্থতা তখনই হবে, যখন আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সময় আর ভালোবাসা দেওয়া বন্ধ করে দিবেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার ওই প্লাস্টিক হাসির সাথে আপনার আসল জীবনের তুলনা করবেন না। অন্যের খেলনা দেখে নিজের সন্তানকে অভাগা ভাববেন না। স্বামীর উপর চাপ দিবেন না।
মনে রাখবেন, একটি মাটির পুতুল নিয়ে আপনার সাথে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া শিশুটি ওই দামী খেলনার স্তূপে একা বসে থাকা শিশুটির চেয়ে অনেক বেশি সুখী এবং মেধাবী হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কারণ সে খেলনা নয়, সে আপনাকে পেয়েছে।
নবম সত্য: আপনার সন্তানের জন্য বাজেট-ফ্রেন্ডলি এক মাস্টার প্ল্যান
সম্মানিত অভিভাবক, আলোচনার এই পর্যায়ে আপনি হয়তো ভাবছেন, সব বুঝলাম, কিন্তু তবুও তো বাচ্চার হাতে কিছু একটা দেওয়া লাগে। আমি আসলে কী কিনব বা কী করব?
খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। মনে রাখবেন, খেলনা কেনা অপরাধ নয়, কিন্তু খেলনা ছাড়া আমার বাচ্চা মানুষ হবে না এই ধারণায় ভোগাটা অপরাধ।
আমরা যখন দোকানের র্যাকে সাজানো দামি খেলনা দেখি, তখন আমাদের চোখ ধসে যায়। কিন্তু বাচ্চার ব্রেইনের কাছে ওগুলো স্রেফ প্লাস্টিক। তার দরকার এমন কিছু, যা তাকে এক্টিভ রাখবে। চলুন বয়সভিত্তিক কিছু বাস্তব টিপস জানার চেষ্টা করি।
১. ৬ মাস থেকে ১ বছর: এই বয়সে আপনার সন্তানের পৃথিবীটা খুব ছোট। সে শুধু আপনার মুখ আর গলার আওয়াজ চিনে।
বই: শক্ত পাতার কিছু ছবির বই কিনতে পারেন। যদি সামর্থ্য না থাকে? কোনো সমস্যা নেই! বাসার ক্যালেন্ডারে থাকা বড় বড় ছবিগুলো তাকে দেখান। রঙিন কাপড় বা ছবিওয়ালা কোনো সাধারণ কাগজই তার জন্য ভিজ্যুয়াল স্টিমুলেশন। (অবশ্যই প্রাণীর ছবি আঁকবেন না)
বল: দামী কোনো সেন্সরি বল লাগবে না। রঙিন কাপড়ের তৈরি নরম একটা বল দিন, যা সে ধরবে বা ছুড়ে মারবে। এতে তার হাতের পেশি মজবুত হবে।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ: প্রচুর কথা বলুন। তাকে কোলে নিয়ে সুরা তিলাওয়াত করুন। আপনার তিলাওয়াতের যে ছন্দ, তা বাচ্চার নিউরনগুলোকে যেভাবে সক্রিয় করবে, দুনিয়ার কোনো মিউজিক্যাল টয় তা পারবে না।
২. ১ থেকে ২ বছর: এই সময় বাচ্চা হাঁটতে শিখে, সবকিছু ধরতে চায়। তাই তাদের বাসারই কিছু অল্প জিনিস দিয়ে খেলনা তৈরি করে দিন।
ব্লক: দামী ব্রান্ডের ম্যাগনেটিক ব্লক লাগবে না। কাঠের কিছু টুকরো বা সাধারণ প্লাস্টিক ব্লক দিন। এই ব্লক দিয়ে সে একবার ঘর বানাবে, একবার টাওয়ার বানাবে। এটাই তার বুদ্ধির আসল কসরত।
রঙিন কাগজ: এক গাদা রঙিন কাগজ আর একটা নিরাপদ আঠা দিন। সে ছিঁড়বে, লাগাবে, আপনার ঘর হয়তো একটু নোংরা করবে কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই ছেঁড়া-জোড়া দেওয়াটাই তার ফাইন মোটর স্কিল ডেভেলপমেন্টের শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম।
বাসার কাজ: এই পয়েন্টটা খুব মন দিয়ে শুনুন। আমরা বাচ্চাকে বলি, সরো! কাজ করতে দাও। অথচ এই বয়সে তাকে আপনার ছোট কাজে সঙ্গী করুন। কাপড় ধোয়ার পর তাকে বলুন, বাবা, এই মোজাটা একটু ওই বালতিতে রাখো তো। জামাটা নিয়ে আসো। এই যে সে একটা দায়িত্ব পালন করল, এটা তার মাঝে 'আই ক্যান ডু ইট' মনোভাব তৈরি করে।
৩. ২ থেকে ৩ বছর: এই বয়সে বাচ্চা অনুকরণ করতে শেখে। সে যা দেখে তা-ই হতে চায়। হাতের কাছে থাকা জিনিস দিয়েই তা সম্ভব।
মাটি বা আটা: আমরা চড়া দামে প্লে-ডো কিনি। অথচ ঘরে থাকা সামান্য আটা বা ময়দা একটু পানি দিয়ে মেখে তার হাতে দিন। সে রুটি বানাবে, গোল্লা বানাবে। এই মাখামাখিটাই তার শ্রেষ্ঠ সেন্সরি প্লে।
রঙ-পেন্সিল: তার হাতে কাগজ আর রঙ পেন্সিল দিন। তাকে আঁকতে দিন। সে কী আঁকছে সেটা বড় কথা নয়, সে যে রঙগুলো নিয়ে ভাবছে, এটাই বড় কথা।
ভান-খেলা (Pretend Play): এটা সবচেয়ে পাওয়ারফুল। তার সাথে ডাক্তার-রোগী খেলুন, দোকানদার-ক্রেতা খেলুন। বাসার ভাঙা একটা বাটি আর চামচ দিয়ে তাকে রান্না রান্না খেলতে দিন। এই খেলাগুলো বাচ্চার ইমাজিনেশন বা কল্পনাশক্তিকে যে লেভেলে নিয়ে যায়, কোনো দামী ভিডিও গেম তার ধারেকাছেও যেতে পারে না।
একটি গোল্ডেন রুল মনে রাখবেন। সবচেয়ে ভালো খেলনা সেটাই, যা দিয়ে শিশু সক্রিয়ভাবে (Active) কিছু করতে পারে।
একটু ভেবে দেখুন তো, একটা ব্যাটারিচালিত দামী গাড়ি, যেটার একটা বাটন চাপলে লাইট জ্বলে আর সামনের দিকে দৌড়ায়, সেখানে আপনার বাচ্চার কাজ কী? সে শুধু দাঁড়িয়ে ওটা দেখে। তার ব্রেইন এখানে প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়। সে স্রেফ একজন দর্শক।
অন্যদিকে, কয়েকটা সাধারণ কাঠের ব্লক বা কিছু খালি বাক্স এটা দিয়ে সে গাড়িও বানাতে পারে, আবার টাওয়ারও বানাতে পারে। এখানে সে স্রেফ দর্শক নয়, সে একজন ইঞ্জিনিয়ার। সে ভাবছে, সে পরিকল্পনা করছে, সে ভুল করছে এবং শিখছে।
সম্মানিত অভিভাবক, দামী খেলনা অনেকক্ষেত্রে আপনার সন্তানকে দর্শক বানায়, আর সাধারণ জিনিস আপনার শিশুকে কারিগর বানায়। আপনিই বলুন, আপনি আপনার সন্তানকে দর্শক বানাতে চান, নাকি কারিগর?
সম্মানিত অভিভাবক, সবশেষে একটা কথা বলতে চাই, আপনার পকেটে আজ ৫-১০ হাজার টাকা নেই বলে আপনি নিজেকে কোনোভাবেই খারাপ বাবা-মা ভাববেন না।
আপনার সন্তানের ঘরে চটকদার মন্টেসরি খেলনা নেই বলে সে দুনিয়া থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে না, এই গ্যারান্টি আমি আপনাকে দিচ্ছি।
একটু ভাবুন তো, আমাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিরা কি কোনো মন্টেসরি স্কুলে গিয়েছিলেন? তাঁরা কি কোনো দামী STEM টয় দিয়ে খেলাধুলা করেছিলেন? অথচ তাঁরা কি সফল হননি? অবশ্যই হয়েছেন। কারণ তাঁরা এমন কিছু পেয়েছিলেন যা আজ আমাদের এই যান্ত্রিক যুগে দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই পেয়েছিলেন:
★ একটি একান্নবর্তী পরিবার
★ পর্যাপ্ত সময়
★ অকৃত্রিম ভালোবাসা
★ সঠিক তারবিয়াহ
★ এবং মা-বাবার সেই কবুল হওয়া দো'আ
আপনার সন্তানও সফল হবে, ইন শা আল্লাহ। সেও বিশ্ব জয় করবে, যদি আপনি তার পাশে থাকেন। খেলনা দেওয়া যাবে না এমন নয়; সামর্থ্য থাকলে বা সময়ের অভাব থাকলে আপনি অবশ্যই তাকে খেলনা দিতেই পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, দামি খেলনা না দিলে ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট হবে না, এই ধারণাটি একটি ডাহা মিথ্যা।
শিশুর মস্তিষ্ক বিকশিত হয় আপনার নিবিড় সান্নিধ্যে, আপনার ভালোবাসায় আর আপনার দেওয়া সঠিক আদর্শে। আর এই অমূল্য সম্পদগুলো তো আপনার কাছেই আছে! এর জন্য তো আপনাকে কোনো বিলিয়নেয়ার হতে হয়নি।
তাই আপনাদের কাছে আমার একটি ছোট অনুরোধ, আজ থেকে যখন আপনার সন্তান ঘুমাতে যাবে, তখন ফোনটা একপাশে রেখে দিন। তাকে আপনার বুকের খুব কাছে টেনে নিন। একটি ছোট গল্প বলুন, কোনো একটা ছড়া শোনান কিংবা তার কপালে হাত রেখে প্রিয় কোনো সুরা তিলাওয়াত করুন। তাকে চোখে চোখ রেখে বলুন, বাবা/মা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
বিশ্বাস করুন, এই মাত্র পাঁচ মিনিটের ভালোবাসা ওই পাঁচ হাজার টাকার খেলনার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। আপনার কোলটাই তার জন্য পৃথিবীর নিরাপদতম রিডিং রুম। আপনিই আপনার সন্তানের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ ইন্সট্রুমেন্ট।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেক, সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার তৌফিক দিন। তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমীন।
লেখক: জাহিদ হাসান। শিশু বিকাশ ও প্যারেন্টিং নিয়ে কাজ করা একজন সাধারণ মানুষ। যিনি বিশ্বাস করেন, সন্তান লালন-পালনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ভালোবাসা ও সময় এবং যার প্রতিটি ভাবনার কেন্দ্রে থাকে সন্তানের সঠিক তারবিয়াহ।