"রাজকন্যার গল্প বনাম রূঢ় বাস্তবতা"
আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত ট্রেন্ড আছে। আমরা ভাবি, মেয়েকে রাজকন্যার মতো করে বড় করলেই বোধহয় মা-বাবার সার্থকতা।
তাকে রোদে যেতে দেব না, তাকে একটা গ্লাস তুলে পানি খেতে দেব না, কাপড় কাঁচতে দিব না, রান্না ঘরের কোনো কঠিন কাজের আঁচ তার গায়ে লাগতে দেব না। বাবা-মা সব সামলে দিবেন।
আমাদের ধারণা, এটাই ভালোবাসা। কিন্তু সম্মানিত অভিভাবক, একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন তো, এটা কি আসলেই ভালোবাসা? নাকি আপনার মেয়েকে ধীরে ধীরে একটা অন্ধকার গর্তের দিকে ঠেলে দেওয়া। জেনে শুনে তাকে ব্যর্থতার জন্য তৈরি করা।
দেখুন, যখন কোনো মেয়েকে পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতার জ্ঞান না দিয়ে শুধু সুবিধা আর লাক্সারির ভেতর বড় করা হয়, তখন তার মনে একটা মরীচিকা তৈরি হয়। সে ভাবতে শুরু করে, আব্বু-আম্মু যেহেতু আমার প্রতিটি আবদার বিনা বাক্যব্যয়ে পূরণ করছে, বাইরের জগতটাও বোধহয় আমার জন্য ঠিক এমনই হবে।
সে মনে করে, দুনিয়াটা কেবলই লাল গালিচায় মোড়ানো। কিন্তু বাস্তবতা? বাস্তবতা বড় কঠিন, বড় নিষ্ঠুর। এখানে কাঁটা আছে, পাথর আছে, ঝড় আছে।
তারপর একদিন বিয়ের পর যখন সেই মেয়েটি অন্য একটি পরিবারে যায়, তখন তার সেই কল্পিত রাজপ্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সেখানে আব্বুর মতো কেউ পানি এগিয়ে দেয় না, আম্মুর মতো কেউ সব কাজ গুছিয়ে রাখে না। সেখানে তাকে দায়িত্ব নিতে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
তখন সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তার মনে হয়, সবাই বোধহয় আমার সাথে অন্যায় করছে। এই যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে বিশাল এক গর্ত এটাই তাকে ঠেলে দেয় ভয়াবহ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার দিকে।
আর এই দায় কার?
এই দায় সেই বাবা-মায়ের, যারা মনে করেছিলেন সন্তানকে দায়িত্বশীল করে গড়ে না তুলে সব সুবিধা দিয়ে রাখাই ভালোবাসা।
এবার একটু পেছনে তাকান।
রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহাকে) ভালোবাসতেন না?
অবশ্যই বাসতেন। তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ছিলেন।
কিন্তু সেই ফাতেমা (রা.)-এর হাতে তো যাঁতা ঘোরানোর কড়া পড়ে গিয়েছিল! তিনি নিজে ঘর সামলাতেন, সন্তান দেখতেন, কাজ করতেন।
এটাই হলো প্রকৃত শিক্ষা। এটাই সঠিক তারবিয়াহ।
মেয়েকে আদর করুন, ভালোবাসুন, কিন্তু তাকে পরনির্ভরশীল করে গড়ে তুলবেন না। বরং তাকে দায়িত্বশীল করুন। তাকে শেখান কীভাবে প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে হয়। তাকে বোঝান যে জীবন মানে শুধু পাওয়া নয়, জীবন মানে অনেক কিছু ছেড়ে দেওয়াও। এটাই তার প্রতি আপনার শ্রেষ্ঠ উপহার।
অন্যদিকে, এখানে স্বামীর ভূমিকাও কিন্তু অনেক বড়।
একজন স্বামী হলো একটা দাঁড়িপাল্লার মতো। তাকে ব্যালেন্স করতে হয়।
একদিকে স্ত্রীর অধিকার আছে, আবার অন্যদিকে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব আছে। স্ত্রীকে বুঝাতে হবে এটা তার নিজের সংসার, আবার পরিবারের অন্যদেরকেও সম্মান দিতে হবে।
মনে রাখবেন, ভারসাম্যহীন ভালোবাসা কখনো শান্তি আনে না। বরং সেটা একসময় অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
সবশেষে বলব, মেয়েকে কাঁচের পুতুল বানিয়ে সাজিয়ে রাখার নাম ভালোবাসা নয়; বরং তাকে জীবনের ঝড়-বৃষ্টিতে টিকে থাকার মতো সক্ষম করে গড়ে তোলাই হলো প্রকৃত অভিভাবকত্ব। তাকে শুধুমাত্র আরাম আর সুবিধা নয়, বরং মূল্যবোধ শিক্ষা দিন। কারণ দিনশেষে সুবিধা ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু মূল্যবোধ তাকে সারাজীবন পথ দেখাবে ইন শা আল্লাহ ।
