মৃত্যুর পরেও পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব
পিতামাতা....
এমন এক শীতল ছায়া, যা মাথার উপরে থাকলে জীবনের কঠিনতম রোদও গায়ে লাগে না। কিন্তু সেই ছায়া যখন সরে যায়, তখন কি আমাদের কর্তব্য ফুরিয়ে যায়?
না, বরং কর্তব্য নতুন মাত্রা পায়, যা পার্থিব জীবনের হিসাবকে ছাপিয়ে গিয়ে আখিরাতের পাথেয় হয়।
আমরা অনেকেই মনে করি, বাবা-মা চলে গেলে (মৃত্যু) তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ। বড়জোর প্রতি বছর মৃত্যু বার্ষিকিতে একটা মিলাদ বা দো'আর আয়োজন করা। কিন্তু ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য গাইডলাইন দিয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে যে, মৃত্যুর পরেও সন্তানের নেক আমল বা ভালো কাজ পিতা-মাতার সাওয়াবের কারণ হয় ও সম্মান বৃদ্ধি করতে পারে। এটি এমন এক সঞ্চয় প্রকল্প, যা আপনি জীবিত অবস্থায় শুরু করে গেছেন এবং তার ফল আপনার অনুপস্থিতিতেও লাভ করে চলেছেন আলহামদুলিল্লাহ ।
ইমাম আন-নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যেই ব্যক্তি তার পিতা-মাতার জন্য উত্তম আচরণ কামনা করে; সে যেন তাদের পক্ষ থেকে উদারভাবে দাতব্য কারণগুলোতে দান করে। এই ধরনের দাতব্য কাজ মৃতদের নিকট তার উপকারিতা প্রসারিত করে এবং মুসলিমদের মধ্যে এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।” [শরহে সহীহ মুসলিম, ১/৮৯]
দেখুন এখানে ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ শুধু একটি কাজের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এটিকে উত্তম আচরণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, পিতা-মাতার প্রতি জীবিতকালে যেমন সেবা-যত্ন করা হয়, তাদের মৃত্যুর পর দান-সাদকা করাটাও সেই সেবারই অংশ।
এখানে লোক দেখানো সামান্য দানের কথা বলা হয়নি বা বছরে একবার পুরো গ্রামকে খাওয়ানোর কথাও বলা হয় নি, বরং বলা হয়েছে উদারভাবে দান করতে, যা থেকে বোঝা যায়, সৎ নিয়তে বড় আকারের দান (যেমন: মসজিদ নির্মাণে সাহায্য, দরিদ্রকে ঘর তৈরি করে দেওয়া, পানির সুব্যবস্থা করা ইত্যাদি) তাদের মৃত্যুর পরেও সাওয়াবের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে ইন শা আল্লাহ। এটি ইসলামের এক অসাধারণ বিশেষত্ব, যেখানে একজন মৃত ব্যক্তিও জীবিত সন্তানের কাজের মাধ্যমে সওয়াব লাভ করতে পারেন।
দান-সাদকা ছাড়াও, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর একজন সন্তানের জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, যা হাদীসের আলোকে প্রমাণিত:
ক. দো'আ ও ইস্তেগফার
এটি সবচেয়ে সহজ এবং সর্বদা করণীয় আমল। আল্লাহ্ তা'আলার কাছে পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা, রহমত এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের জন্য নিয়মিত দো'আ করা।
হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার পিতামাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিবেন’। (সূরা ইব্রাহিম: ৪১)
খ. ওসিয়ত পূর্ণ করা
পিতা-মাতা যদি জীবিতকালে কারো কাছে কোনো ওয়াদা বা ঋণ করে যান, তবে সন্তানের কর্তব্য হলো দ্রুততম সময়ে সেই ওয়াদা বা ঋণ পূর্ণ করা।
গ. আত্মীয় ও বন্ধুর প্রতি সম্মান
পিতা-মাতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং যারা তাদের ভালোবাসতেন, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের প্রতি সদাচরণ করা। এটি পিতা-মাতার সম্মানকে রক্ষা করারই নামান্তর।
ঘ. তাদের সৎকাজগুলো চালু রাখা
পিতা-মাতা যদি কোনো ভালো কাজ (যেমন: কোনো শিক্ষামূলক উদ্যোগ বা অসহায়কে সাহায্য) চালু করে যান, তবে সন্তানের উচিত সেই কাজটিকে চালু রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এটি সাদকায়ে জারিয়াহ বা প্রবাহমান দানের অন্তর্ভুক্ত।
পিতা-মাতা আমাদের জন্য জান্নাতের একটি দরজা। জীবিতকালে সেবা করে আমরা যেমন সেই দরজার চাবি অর্জন করতে পারি, তেমনি তাদের মৃত্যুর পরও এই আমলগুলো হলো সেই চাবিটিকে সচল রাখার কৌশল।
মনে রাখবেন, জীবন কেবল এই ক্ষণিকের যাত্রাপথ নয়, এটি একটি পরীক্ষার হল। আর পিতা-মাতা সেবা ও আনুগত্য সেই পরীক্ষার হলে আমাদের জন্য সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার সুযোগ এনে দেন। জীবিত থাকাকালীন সেবা-যত্নের পাশাপাশি মৃত্যুর পর তাদের জন্য আপনার প্রতিটি আমল হলো তাদের প্রতি আপনার ভালোবাসার শেষ চিঠি, যা তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করবে ইন শা আল্লাহ।
🌿 কথাগুলো সন্তানদের জানানোর পাশাপাশি, নিজেরাও নিজ পিতা-মাতা সাথে উত্তম আচরণ করে সন্তানকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিবেন।