"মা ও বিবাহিত ছেলের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল"
ওহে মহীয়সী মা—
যার পায়ের নিচে (সন্তুষ্টিতে) মহান আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে রেখেছেন; যার চোখের এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু আরশের অধিপতির দরবারে অসন্তুষ্টির কারণ হয়; আর যার দু’হাত তোলা আকুল মোনাজাতের ওপর অনেকক্ষেত্রেই নির্ভর করে একজন সন্তানের দুনিয়ার সমস্ত সফলতা ও আখিরাতের অনন্ত মুক্তি। আজ আপনার কাছে কিছু কথা বলতে চাই।
সম্মানিত মা! আজ আপনার সামনে কোনো অভিযোগের ডালি নিয়ে আসিনি, বরং এসেছি এক ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মুসাফিরের আর্তি নিয়ে। যে মুসাফির সারাদিন জীবনের তপ্ত রোদে পুড়ে, রুক্ষ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দিনশেষে আপনার আঁচলের শীতল ছায়াতলে একটু প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে চায়।
আপনি তো সেই জননী, যার দো'আর বরকতে আসমান থেকে সন্তানের জন্যে রহমতের বারিধারা নামে। কিন্তু আজ কেন আপনার সেই মমতাময়ী দু’চোখে সন্তানের প্রতি কেবল অভিযোগের কালো মেঘ জমে থাকে? আজ কেন আপনার হৃদয়ের প্রশস্ত আঙিনায় আপনারই কলিজার টুকরো সন্তানটি একটুখানি আশ্রয় পেতে হিমশিম খায়? এই সন্তানের ভালোবাসায় যার হৃদয় সদা উন্মুক্ত, তাঁর হৃদয়ে কেন আজ এত সংশয়, কেন এত অভিমানের পাহাড়?
আপনি যখন আপনার বুকের মানিককে ধুমধাম করে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েছিলেন, তখন কি তা কেবল এক সন্ধ্যার উৎসব ছিল? না মা! তা ছিল তার জীবনের এক নতুন দিগন্তের সূর্যোদয়।
একটু কি ভেবে দেখেছেন সেই ছোট্ট শিশুটির কথা, যে একদিন আপনার আঙুল ধরে টলমল পায়ে হাঁটতে শিখেছিল? একটু ব্যথা পেলেই যে আপনার বুকে মুখ লুকিয়ে দুনিয়ার সব ভয় ভুলে যেত?
আজ সেই শিশুটিই সময়ের আবর্তে এক বিশাল সমুদ্রের মাঝি। আজ তার কাঁধে কেবল আপনার আঁচলের শীতল ছায়া নয়, বরং একটি নতুন পরিবারের দায়িত্বের প্রখর রোদ। সে আজ মাঝ সমুদ্রে একলা দাঁড়িয়ে পাল সামলাচ্ছে মা! তাকে কি এই ঝোড়ো হাওয়ায় একটু সাহস দিবেন না? নাকি আপনার অভিমানের তুফানে তার নৌকোটিকে আরও টালমাটাল করে দিবেন?
সম্মানিত মা, সে তো আজও আপনার সেই ছোট্ট খোকাটিই আছে, কেবল তার দায়িত্বের পরিধিটা আজ আসমানের মতো বড় হয়ে গেছে। তাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, তার জান্নাতের পথটাকে আপনার একটুখানি মুচকি হাসি দিয়ে সহজ করে দিন।
🌻 কেন এই পবিত্র বন্ধনের সূচনা?
সম্মানিত মা, স্মৃতির আয়নায় কি একবার ভেসে ওঠে সেই দিনটির কথা? যেদিন আপনি নিজেই সাগ্রহে, অনেক স্বপ্ন বুনে আপনার সন্তানের জন্য জীবনসঙ্গিনীকে পছন্দ করে ঘরে এনেছিলেন? আপনিই তো সেদিন বলেছিলেন, "আমার ছেলেটার জন্য একটা শান্ত মেয়ে চাই, যে আমার ঘরটা আলো করে রাখবে।" আপনি তো চেয়েছিলেন আপনার কলিজার টুকরোটি যেন একা না হয়ে যায়, তার দীর্ঘ জীবনের পথে যেন একজন বিশ্বস্ত সাথী থাকে যে তার সুখ-দুঃখের ভাগীদার হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কত চমৎকার করে বলেছেন: “যখন কোনো বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে নেয়।” (মিশকাত)
মাগো! আপনি তো আপনার ছেলেকে সেদিন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে বিয়ে দেননি; বরং তাকে দ্বীনের পথে পূর্ণতা দিতে, সুন্নাহর এক জান্নাতী বাগানে প্রবেশ করাতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েছিলেন।
তবে আজ কেন সেই মেয়েটি, যাকে আপনি নিজে হাত ধরে ঘরে তুললেন, আপনার কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়? কেন আজ মনে হয় সে আপনার ছেলেকে আপনার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে?
সম্মানিত মা, ভালোবাসা তো কোনো পার্থিব সম্পদ নয় যে ভাগ করলে কমে যাবে। ভালোবাসা তো হলো মোমবাতির আলোর মতো, এক মোমবাতি থেকে আরেকটিতে আলো জ্বালালে আগের মোমবাতিটির আলো বিন্দুমাত্র কমে না, বরং পুরো ঘরটির অন্ধকার আরও দ্রুত দূরীভূত হয়।
আপনার ছেলে তো সেই আগের মতোই আছে, শুধু তার হৃদয়ের বাগানে একটি নতুন ফুল ফুটেছে। সেই ফুলের সুবাস কি আপনার বাগানকে আরও সুশোভিত করতে পারে না?
আপনি যদি আজ আপনার পুত্রবধূকে আপনার ছেলের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেন, তবে অজান্তেই আপনি আপনার ছেলের শান্তির ঘরটিকে একটি রণক্ষেত্রে পরিণত করছেন। সে কার দিকে তাকাবে মা? একদিকে আপনি—তার জান্নাত, অন্যদিকে স্ত্রী—তার দ্বীনের অর্ধেক। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আপনার সেই আদরের সন্তানটি কি নীল হয়ে যাচ্ছে না?
তাকে একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে দিন মা। বিশ্বাস করুন, সে পর হয়ে যায়নি; সে কেবল আপনার এনে দেওয়া আমানতটি রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
🌻 তার কাঁধের অদৃশ্য বোঝাটি কি দেখতে পান?
মাগো! একটু সময় হবে কি? একবার চোখ দুটো বন্ধ করে আপনার সন্তানের দিনলিপিটা একটু ভাবুন তো! ভোরবেলা যখন পৃথিবীটা কেবল জাগতে শুরু করে, তখন আপনার সেই সন্তানটি এক বিশাল পাহাড় সমান দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আপনি কি তার সেই অদৃশ্য বোঝাটি দেখতে পান?
তাকে লড়াই করতে হয় এই রুক্ষ পৃথিবীর সাথে। কখনো বসের তপ্ত বাক্য, কখনো ট্রাফিক জ্যামের ক্লান্তি, আবার কখনো অভাবের সাথে তীব্র যুদ্ধ—সবই সে সহ্য করে নিঃশব্দে।
কেন জানেন মা? যাতে মাস শেষে আপনার হাতে ওষুধের টাকাটা তুলে দিতে পারে, যাতে আপনার নাতি-নাতনিরা একটু ভালো খেতে পারে, যাতে আপনাদের মুখে একটু হাসির ঝিলিক দেখতে পায়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) আক্ষেপ করে বলতেন: “মানুষের পরিস্থিতি না বুঝে কেবল নিজের আবেগের ওপর ভিত্তি করে তাকে বিচার করা হলো এক প্রকার জুলুম।”
সম্মানিত মা, সারাদিন বাইরের তপ্ত রোদে পুড়ে সে যখন তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো ঘরে ফিরে, তখন সে আপনার কাছে একটু শীতল সান্নিধ্য আর একটু সান্ত্বনার হাসি খোঁজে। কিন্তু ঘরে ঢোকামাত্রই যদি সে আপনার একরাশ অভিযোগ আর অভিমানে বিদ্ধ হয়, তবে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে মা? কার কাছে গিয়ে সে তার ক্লান্তির কথা বলবে?
সে তো কোনো ইস্পাতের তৈরি যন্ত্র নয়, সে রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। সে একই সাথে আপনার কলিজার টুকরো সন্তান, কারো নির্ভরতার স্বামী, আবার কারো আদর্শ বাবা। এই ত্রিবিধ দায়িত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সে আজ দিশেহারা।
মা, সে হয়তো আগের মতো আপনার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে গল্প করতে পারছে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে। বরং তার নীরবতা হলো তার ক্লান্তির ভাষা।
আপনার সেই আদরের খোকাটি আজ পরিস্থিতির চাপে বড় বেশি পরিশ্রান্ত। তাকে অপরাধী না ভেবে একটু মমতার হাত কি বাড়িয়ে দেওয়া যায় না? আপনার একটি মাত্র সান্ত্বনার বাক্য—“বাবা, তুই খুব কষ্ট করছিস, আল্লাহ তোর সহায় হোন” তার সারাদিনের সমস্ত বিষাদকে মুহূর্তেই জান্নাতী প্রশান্তিতে বদলে দিতে পারে।
🌻 তিলকে কেন তাল করছেন?
মাগো! সামান্য একটি চির ধরলে কি আস্ত একটি দালান ভেঙে ফেলতে হয়? কখনো হয়তো এমন হয়েছে, আপনার ছেলেটি কাজের চাপে বা নিদারুণ ক্লান্তিতে আপনার একটি ফোন ধরতে পারেনি! ভালো করে কথা বলতে পারে নি! অথবা হয়তো কোনো পারিবারিক তর্কে সে তার স্ত্রীর কোনো একটি যৌক্তিক কথার পিঠে সায় দিয়েছে?
ঠিক সেই মুহূর্তেই কি আপনার মনে হয় সে আপনার অবাধ্য হয়ে গেছে? অমনি কি অবলীলায় বলে ফেলেন, “ছেলে আমার পর হয়ে গেছে, বউয়ের আঁচলে বাধা পড়েছে!”
সম্মানিত মা, আপনার এই একটি মাত্র বাক্য আপনার ছেলের কলিজায় বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে। সে তখন না পারে সইতে, না পারে কাউকে দেখাতে। যে মা তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন, সেই মায়ের মুখ থেকে এমন ‘পর’ করে দেওয়া বাক্য শুনলে তার পৃথিবীটা কি ওলটপালট হয়ে যায় না?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক অনুমান থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই কিছু অনুমান পাপ।” (সূরা হুজুরাত: ১২)
সম্মানিত মা, আপনি কি জানেন, আপনার সেই তিল পরিমাণ সন্দেহ আপনার ছেলের সাজানো সংসারটাকে কতটা বিষিয়ে তোলে?
মায়েরা তো হন ক্ষমার অতল সমুদ্র। জোয়ার-ভাটায় কত ময়লা-আবর্জনা সেই সমুদ্রে এসে পড়ে, কিন্তু সমুদ্র কি কখনো তার বিশালতা হারায়? সেই ক্ষমার সমুদ্র কি আজ সামান্য অভিমানে শুকিয়ে যাবে?
সে তো আপনারই অংশ। ছোটবেলায় সে যখন বারবার আপনার শখের হাঁড়ি-পাতিল ভেঙে ফেলত, তখন তো আপনি তাকে বুক থেকে সরিয়ে দেননি। তবে আজ কেন সামান্য ভুল বুঝাবুঝিতে তাকে ‘পর’ করে দেওয়ার অপবাদ দিচ্ছেন?
আপনার পুত্রবধূ আপনার সন্তানের জন্যে আমানত। আপনার ছেলে যদি সেই আমানতের প্রতি একটু সদয় হয়, তবে কি আপনার অধিকার কমে যায়? মোটেও না মা!
আপনি যদি তাকে ছোট ছোট বিষয়ে ক্ষমা না করেন, তবে এই বিশাল স্বার্থপর পৃথিবীতে তার পরম আশ্রয় আর কোথায় বাকি থাকে?
আপনার কাছে হার মানলেই তো সে জিতে যায়, কিন্তু আপনি যদি তাকে অপরাধী বানিয়ে দূরে ঠেলে দেন, তবে সে কার কাছে গিয়ে তার কষ্টের কথা বলবে?
সম্মানিত মা, দয়া করে তিলকে তাল করবেন না। সামান্য মেঘ দেখে আপনার স্নেহের সূর্যটাকে ঢেকে দিবেন না। আপনার ক্ষমা ও উদারতাই পারে তার এই কঠিন পথটাকে জান্নাতী প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে।
🌻 আপনার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবুন!
মাগো! একটু কি স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে পেছন ফিরে তাকাবেন?
আপনার কি মনে পড়ে সেই দিনটির কথা, যেদিন আপনি নিজে এক জোড়া কম্পিত পায়ে লাল শাড়ি পরে এই অচেনা বাড়িতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন? সেদিন আপনার বুকেও তো একরাশ ভয় আর দুশ্চিন্তা ছিল। আপনার কি সেদিন সব জানা ছিল মা? আপনি কি জানতেন কার পছন্দ কী, কার মেজাজ কেমন? নিশ্চয়ই না। আপনারও ভুল হতো, আপনারও হাত থেকে লবণের কোটা পড়ে যেত, আপনারও রান্নায় কখনো নুন বা ঝাল বেশি হতো।
একটু ভাবুন তো মা, সেদিন আপনার শাশুড়ি যদি আপনার প্রতিটি ছোট ভুলকে বড় করে দেখতেন বা দেখেছে, তবে আপনার কেমন লাগত? আপনার কি সেদিন মনে হতো না বা হয় নি যে, আমার স্বামী অন্তত একবার আমার পাশে দাঁড়াক, অন্তত একবার আমাকে আগলে ধরুক?
আজ আপনার পুত্রবধূ ঠিক সেই একই পথ দিয়ে হাঁটছে যে পথ আপনি আজ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে মাড়িয়ে এসেছিলেন।
সম্মানিত মা, আপনি তো আজ একজন অভিজ্ঞ নাবিক। আপনি জানেন এই সংসারের জোয়ার-ভাটা। তবে আজ কেন সেই অভিজ্ঞতার আলো দিয়ে নতুনের পথকে আলোকিত না করে, নিজের পুরনো ক্ষতগুলোর প্রতিশোধ নিচ্ছেন?
আজ আপনার পুত্রবধূকে যদি আপনি শাশুড়ি হয়ে শাসন না করে, মা হয়ে তার ভুলগুলো নিজের আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখতেন, তবে সে কি আপনার চিরদিনের পরম ভক্ত হতো না? সে কি আপনার জন্য তার জান লড়িয়ে দিত না?
মনে রাখবেন মা, আপনি আজ যা বপন করবেন, আপনার নাতি-নাতনিরা ঠিক সেটিই ফসল হিসেবে কাটবে। তারা যখন দেখবে তাদের দাদি তার পুত্রবধূকে মায়ের মমতা দিয়ে আগলে রাখছেন, তখন তাদের হৃদয়ে আপনার প্রতি শ্রদ্ধার যে মিনার তৈরি হবে, তা কখনো ভাঙবে না। কিন্তু তারা যদি দেখে আপনি কেবল শাসন আর অভিযোগের পাহাড় গড়ছেন, তবে তারাও একদিন আপনাকে হয়তো সেই একই চোখে দেখবে।
সম্মানিত মা, আপনি তো ঘরের বরকত। আপনার হাত ধরেই তো এই সংসারে শৃঙ্খলা এসেছে। আজ আরেকজন আপনার সেই উত্তরাধিকার বইতে এসেছে; তাকে প্রতিপক্ষ না ভেবে নিজের প্রতিচ্ছবি ভাবুন।
তাকে একটু ছাড় দিন, একটু মমতা দিন। দেখবেন, আপনার ছেলেটি দুই আগুনের মাঝখানে পুড়ে ছাই হওয়া থেকে বেঁচে গিয়ে আপনার প্রতি আরও কৃতজ্ঞ হয়ে উঠবে। আপনার একটুখানি উদারতা একটি ঘরকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিতে পারে।
🌻 জান্নাতের দরজা কি বন্ধ করে দিবেন?
মাগো! আপনি কি জানেন আপনার মর্যাদা কত উঁচুতে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ কত চমৎকার করে আপনার অবস্থান বর্ণনা করেছেন: “মা হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। তুমি চাইলে এই দরজা রক্ষা করতে পারো, আর চাইলে তা নষ্ট করে ফেলতে পারো।” (তিরমিযি)
সুবহা-নাল্লাহ! মা, এই সম্মান তো কোনো মানুষের দেওয়া নয়, স্বয়ং রাব্বুল আলামিন আপনাকে এই মহান মর্যাদা দিয়েছেন।
আপনার ছেলেও তো হন্যে হয়ে সেই জান্নাতটিই খুঁজছে। সে তো চায় আপনার সেবা করে, আপনার পায়ের ধুলো মেখে (সন্তুষ্টি) সেই মধ্যবর্তী দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে।
কিন্তু মা, আপনি যদি তুচ্ছ কোনো কারণে, সামান্য দুনিয়াবী অভিমান কিংবা অহেতুক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার ওপর মুখ ভার করে থাকেন, প্রতিনিয়ত রাগ করেন, তবে তার জান্নাতের পথ কি আপনি নিজেই কাঁটা দিয়ে ভরে দিচ্ছেন না?
একটু ভেবে দেখুন তো মা, আপনি তো আল্লাহ তা'আলার দয়ায় তার রক্ষক হওয়ার কথা ছিল। আপনার এক চিলতে হাসিমুখের দো'আয় তার বন্ধ হয়ে যাওয়া রিজিকের দুয়ার খুলে যেতে পারে; আপনার একটুখানি মোনাজাতে তার মাথার ওপর থেকে পাহাড় সমান বিপদ সরে যেতে পারে। সে তো সেই সন্তান, যে কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলাকে খুশি করে জান্নাতের দিকে দৌড়াতে চায়।
তবে আজ কেন সামান্য ভুল বুঝাবুঝিকে এত বড় করে দেখছেন যে, আপনার সেই আদরের সন্তানটি আপনার সামনে আসতে ভয় পায়? আপনার দীর্ঘশ্বাস কি তার আকাশটাকে কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছে না? মা, অভিমান তো ক্ষণিকের, কিন্তু আপনার দো'আ তো চিরস্থায়ী।
দয়া করে তুচ্ছ কোনো পার্থিব পাওয়ার আশায় কিংবা কারো কথায় প্ররোচিত হয়ে আপনার সেই জান্নাতের দরজাটি তার মুখের ওপর বন্ধ করে দিবেন না। বরং তার ভুলগুলোকে সেই ছোটবেলার মত ক্ষমা করে দিন, তার জন্য দু'হাত তুলে রবের কাছে কান্না করুন। আপনার সন্তুষ্টিতেই তো তার জান্নাত। তাকে সেই জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ করে দিন মা।
🌻 পার্থিব মায়া বনাম আখিরাতের পাথেয়
মাগো! আমরা তো সবাই এই দুনিয়ায় মাত্র কয়েক দিনের মুসাফির। এই ঘর-বাড়ি, এই সাজানো সংসার, এমনকি আপনার এই আদরের সন্তান, সবই তো মহান রবের দেওয়া ক্ষণস্থায়ী আমানত। আজ আপনি আপনার সন্তানের ওপর যে একচ্ছত্র অধিকার নিয়ে লড়াই করছেন, একটু ভাবুন তো মা, যেদিন আমাদের সবাইকে সেই মালিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, সেদিন কি এই তুচ্ছ মান-অভিমান আর পার্থিব চাওয়া-পাওয়া কোনো কাজে আসবে?
আপনার কলিজার টুকরো ছেলেটি, যাকে আপনি ছোটবেলা থেকে তিলে তিলে মানুষ করেছেন, সে যদি কেবল আপনার ভুল বুঝাবুঝি আর মানসিক চাপের কারণে সারাক্ষণ অস্থিরতায় থাকে, তবে সে কি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে? আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন মা, আপনার সামান্য একটু কঠোরতা বা অপ্রয়োজনীয় অভিযোগের কারণে যদি আপনার সন্তানের আমলনামা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কাল কিয়ামতের কঠিন দিনে আপনার কেমন লাগবে? আপনি কি চাইবেন আপনার আদরের সন্তানটি আপনার কারণেই মহান রবের কাছে লজ্জিত হোক?
সম্মানিত মা, দুনিয়ার এই সামান্য মায়া আর 'আমি বড়' এই অহমিকা কাটিয়ে একটু উদার হোন না! আজ যদি আপনি আপনার ছেলের সংসারের ছোটখাটো ভুলগুলোকে মাফ করে দিয়ে বড় হৃদয়ের পরিচয় দেন, তবে আসমানে আপনার মর্যাদা কত উঁচুতে উঠে যাবে, আপনি কি তার কল্পনা করতে পারেন?
ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলতেন: “দুনিয়ার মায়া মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কিন্তু আখিরাতের চিন্তা মানুষকে মহানুভব করে।”
সম্মানিত মা, এই দুনিয়া তো দু’দিনের। আজ হয়তো আপনার মনে হচ্ছে আপনার অধিকার খর্ব হচ্ছে, কিন্তু আপনার এই নিরব ধৈর্য আর উদারতা আপনার জন্য আখিরাতে এক বিশাল পাথেয় হয়ে দাঁড়াবে। আপনার ছেঁড়া আঁচল দিয়ে যেমন ছোটবেলায় তার চোখের জল মুছিয়ে দিতেন, আজ তেমনি আপনার উদারতা দিয়ে তার সংসারের ঝড়গুলো থামিয়ে দিন।
বিশ্বাস করুন মা, আপনি যখন দুনিয়ার এই তুচ্ছ চাওয়াগুলো বিসর্জন দিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপনার সন্তান ও তার স্ত্রীকে হাসিমুখে গ্রহণ করবেন, তখন জান্নাতের সুবাতাস আপনার এই ঘরটিতেই বইতে শুরু করবে। আপনার এই মহত্ত্বই আপনাকে কেবল একজন সফল মা হিসেবে নয়, বরং একজন জান্নাতী নারী হিসেবে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করবে ইন শা আল্লাহ ।
🌻 সে আপনার সেই আদরের খোকাই আছে
মাগো! বাইরের এই শক্ত-সামর্থ্য মানুষটাকে দেখে আপনি কি তবে বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন? আপনি কি ভাবছেন, তার গোঁফের রেখা আর চওড়া কাঁধ তাকে আপনার থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে?
সম্মানিত মা, রাতের নিস্তব্ধতায় যখন সারা পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন, যখন আপনার পুত্রবধূ আর নাতি-নাতনিরাও ঘুমিয়ে পড়ে—তখন কি কখনো আপনার সেই ছেলেটির মনের খবর নিয়েছেন? সেই মুহূর্তগুলোতে সে হয়তো একা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হয়তো অন্ধকারে বালিশে মুখ গুঁজে সে নিঃশব্দে কাঁদে। সে তার সেই হারানো সোনালী শৈশব খোঁজে, যেখানে কোনো দায়িত্ব ছিল না, ছিল কেবল আপনার আঁচলের ওম। সে আজও আপনার সেই হাতের নোনতা ভাতের স্বাদ মিস করে, সে আজও চায় আপনার কোলে মাথা রেখে দুনিয়ার সব ভুলে একটু চোখ বুজতে।
সে আপনাকে আগের মতোই ভালোবাসে মা, বরং আগের চেয়েও হয়তো বেশি। কিন্তু সংসারের সহস্র দায়িত্বের জাঁতাকল তাকে আজ মৌন করে দিয়েছে। সে আজ এক কঠিন শৃঙ্খলে বন্দি।
সম্মানিত মা, পুরুষ মানুষ তো সহজে চোখের জল ফেলতে পারে না। কারণ তাকে সবার সামনে বটগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাকে শিখানো হয়েছে, "পুরুষের কাঁদতে নেই, পুরুষকে শক্ত হতে হয়।" এই শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে সে আজ নিজের কান্নাগুলোকেও ভেতরে গিলে ফেলছে। কিন্তু সেই কঠোর বর্মের নিচে আজও লুকিয়ে আছে আপনার সেই ছোট্ট শিশুটি—যে একদিন আপনার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছিল, যে একটু ব্যথা পেলেই আপনার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠত।
বিশ্বাস করুন মা, সে পর হয়ে যায়নি। সে কেবল জীবনের এক উত্তাল সমুদ্রের মাঝি, যাকে পাল সামলাতে গিয়ে এখন দিশেহারা হতে হচ্ছে। সে আপনার আদরের কাঙাল, আপনার একটুখানি স্নেহের স্পর্শের জন্য সে তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো চেয়ে থাকে। সে যখন আপনার সামনে আসে, তখন তার ভুলগুলো না খুঁজে, তাকে একবার সেই পুরোনো দিনের মতো জড়িয়ে ধরুন না মা! একবার তার মাথায় হাত রেখে বলুন—"বাবা, তুই তো আমার সেই খোকাই আছিস।" দেখবেন, আপনার সেই পাহাড় সমান শক্ত ছেলেটি মুহূর্তেই মোমের মতো গলে আপনার পায়ের কাছে ভেঙে পড়বে। তার ভেতরের সেই শিশুটিকে আজ আর দূরে ঠেলে দিবেন না মা। সে বড় একা, তাকে আপনার দো'আর চাদরে আর ভালোবাসার ওমে আগলে রাখুন।
হে আমার পরম শ্রদ্ধেয় এবং মহিয়সী মা,
আপনার কাছে আমার শেষ আরজি—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনার হৃদয়কে সেই প্রশস্ত সাহারার মতো বিশাল করে দিন, যেখানে সবার জন্য ঠাঁই আছে। আপনি আপনার ছেলের জন্য, তার স্ত্রীর জন্য এবং তাদের ছোট্ট সংসারটির জন্য একটু দু’হাত তুলে মন খুলে দো'আ করুন।
মাগো, যখন আপনি আপনার পুত্রবধূকে কেবল ‘পরের মেয়ে’ না ভেবে নিজের অপূর্ণ কোনো স্বপ্ন বা নিজের গর্ভজাত মেয়ের মতো মমতা দিয়ে আগলে ধরবেন, তখন দেখবেন আপনার সেই ছেলেটি কৃতজ্ঞতায় আপনার কোলে লুটিয়ে পড়ছে। সে তখন আপনাকে কেবল মা হিসেবে নয়, বরং তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাত্রী হিসেবে আগের চেয়েও হাজার গুণ বেশি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা উজাড় করে দিবে।
আপনার সামান্য একটু উদারতা একটি পরিবারকে নরক হওয়া থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের বাগানে পরিণত করতে পারে।
আসুন মা, আমরা সবাই মিলে সেই রবের দরবারে হাত তুলি—
হে আল্লাহ! আমাদের মায়েদের অন্তরে প্রশান্তির শীতল ঝর্ণাধারা বইয়ে দিন। তাদের হৃদয় থেকে সব অভিমান আর অভিযোগের মেঘ সরিয়ে দিন।
হে দয়াময় রব্বুল আলামিন! আমাদের ছেলেদের ধৈর্য ধারণ করার এবং ইনসাফ কায়েম করার তৌফিক দান করুন, যাতে সে মায়ের হক এবং স্ত্রীর অধিকার, উভয়টিই সুচারুভাবে পালন করতে পারে।
হে আল্লাহ! আমাদের ঘরগুলোকে বিবাদ আর তিক্ততার নরক বানাবেন না; বরং সেগুলোকে আপনার যিকর, ইবাদত এবং পারস্পরিক ভালোবাসার এক একটি ‘জান্নাতী বাগিচা’ বানিয়ে দিন। আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের শেষে আপনি আমাদের সবাইকে আপনার জান্নাতুল ফিরদাউসে একত্রিত করুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
বি:দ্র: আমার পরম শ্রদ্ধেয় মায়েরা, আজকের এই নসিহা কেবল আপনাদেরই উদ্দেশ্যে, যাঁরা মনে করছেন বিয়ের পর আপনার কলিজার টুকরো সন্তানটি বুঝি পর হয়ে গেছে।
আমি জানি, একটি সংসার সুন্দর রাখতে সন্তানদের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি পুত্রবধূদেরও রয়েছে অনেক কর্তব্য। তাঁদের ভুল-ত্রুটি এবং সংশোধনের বিষয়ে আমি আগেও নসিহা করার চেষ্টা করেছি এবং ইনশাআল্লাহ আগামীতেও সেই সিলসিলা জারি থাকবে।
কিন্তু আজ আমি কেবল আপনাদের হৃদয়ে কড়া নেড়েছি, কারণ আপনারা হলেন ঘরের বটবৃক্ষ। বটবৃক্ষ যদি ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া না দেয়, তবে সেই তপ্ত রোদে পুরো পরিবারটিই যে ঝলসে যাবে! তাই আজকের এই আলোচনাটি কেবল আপনাদের মমতা আর উদারতাকে একটু জাগিয়ে তোলার এক বিনীত প্রয়াস। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকের পরিবারে সুখ ও প্রশান্তি দান করুন। আমীন।
