প্রকৃত পুরুষত্ব: ছেলে সন্তানদের যে শিক্ষা দিতেই হবে
একবার একজন বিজ্ঞ বাবা তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন: হে আমার আদুরের সন্তান! তুমি সিংহের পেছনে হাঁটবে, কিন্তু কখনো কোনো (বেগানা) নারীর পেছনে হেঁটো না।
প্রথম দর্শনে এই কথাটি শুনে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। আরে সিংহের পেছনে হাঁটা? এটাতে তো প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে! কিন্তু নারীর পেছনে হাঁটতে নিষেধ করা হলো কেন?
সত্যিকার অর্থে ছোট্ট এই উপদেশের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর প্রজ্ঞা এবং পুরুষত্বের প্রকৃত সংজ্ঞা।
এখানে মূলত একটি তুলনামূলক দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। সিংহ এক হিংস্র প্রাণী। তার পেছনে হাঁটা মানে দৃশ্যমান শারীরিক ঝুঁকি। এখানে বিপদের সীমা স্পষ্ট। বড়জোর নশ্বর এই দেহটা ক্ষতবিক্ষত হবে, প্রাণপাখি উড়ে যাবে। কিন্তু একজন মুমিনের আত্মা তো সেখানে অন্তত সুরক্ষিত থাকবে।
অন্যদিকে, নারীর ফিতনা থেকে নিজেকে সংবরণ করতে না পারা মানে এক অদৃশ্য গর্তে পা বাড়ানো। এই বিপদ শুধু রক্ত-মাংসের শরীরের নয়, বরং এটি সরাসরি আঘাত হানে ঈমানের মূলে (ক্বলবে)। সিংহের আক্রমণে হয়তো দেহ হারিয়ে যাবে, কিন্তু কুদৃষ্টি আর হারামের মোহে মানুষ তার আখিরাতকেই হারিয়ে ফেলবে। এই ফিতনা একজন মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতায় নিমজ্জিত করতে পারে, ঈমান দুর্বল করে দিতে পারে এবং চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়া জরুরি। এই বর্ণনা কোনোভাবেই নারীজাতিকে অপমান বা হেয় করার জন্য নয়। বরং এটি পুরুষদের জন্য একটি সতর্কবাণী যে, তারা যেন তাদের নফসের (প্রবৃত্তির) দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখে।
ইসলামে নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু শয়তান নারী-পুরুষের মধ্যে হারাম সম্পর্ক তৈরি করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এবং ফাঁদ তৈরি করে। আর এই ফিতনা থেকে বেঁচে থাকাই প্রকৃত পুরুষত্বের পরিচয়।
দেখুন, সিংহের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো সাহসিকতা হতে পারে, কিন্তু নিজের চোখ আর অন্তরকে হারামের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা হলো মহাবীরত্ব। যে পুরুষ নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না, সে তো প্রকৃত অর্থে কাপুরষ! সে কখনোই আসল পুরুষ হতে পারবে না।
আজকের যুগে "পুরুষত্ব" বলতে অনেকে বুঝে থাকেন শক্তিসমর্থ শরীর, সিক্স প্যাক অ্যাবস, স্ট্যাইল করা চুল-দাড়ি, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ইত্যাদি। এছাড়াও বিভিন্ন মিডিয়ায় রঙ বেরঙের বিজ্ঞাপনে পুরুষদের বিভিন্নভাবে আসল পুরুষ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করা হয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত পুরুষত্বের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আসুন আজক আমরা সত্যিকার আসল পুরুষ কারা তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো এবং আমাদ সন্তানদের এমন আসল পুরুষ হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
১. দৃষ্টি অবনত রাখা
প্রকৃত পুরুষ পেশিবহুল শরীরের অধিকারী কেউ নয়, বরং সে-ই আসল বীর যে তার চোখের লাগাম টেনে ধরতে পারে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন: মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে........ " [সূরা নূর: ৩০]
দৃষ্টি হলো হৃদয়ের সদর দরজা। যে যুবক রাস্তার মোড়ে কিংবা ফেসবুকের স্ক্রিনে অবাধ দৃষ্টির বন্যা বইয়ে দেয়, সে ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের সিংহাসন হারায়। আজকের যুগে দৃষ্টি সংযত রাখা কোনো সাধারণ কাজ নয়, এ এক কঠিন নফসের জিহাদ। এই জিহাদে যে বিজয়ী, সে-ই আল্লাহর দরবারে আসল পুরুষ।
২. আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করা
বাহ্যিক চাকচিক্য যতই থাকুক না কেন, যদি কারো হৃদয়ে আল্লাহর ভয় না থাকে, তাহলে সে প্রকৃত পুরুষ নয়। প্রকৃত পুরুষ হলো সেই ব্যক্তি যে অন্ধকার ঘরে একা থাকা অবস্থাতেও আল্লাহকে ভয় করে।
যখন কোনো সুন্দরী নারী তার সামনে নিজেকে পেশ করে, সে তখন আল্লাহকে স্মরণ করে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের মতো বলে: "সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে বলল, এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।) সে (ইউসুফ) বলল, আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" [সূরা ইউসুফ: ২৩]
অর্থাৎ নির্জনে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করাই হলো পুরুষত্বের সর্বোচ্চ আভিজাত্য।
৩. যেনা/ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা
ইসলামে যেনা/ব্যভিচার একটি জঘন্যতম পাপ। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: "আর তোমরা যেনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" [সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২]
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলেননি ব্যভিচার করো না, বরং বলেছেন ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। অর্থাৎ যা কিছু যেনা- ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়, সেসব থেকেও দূরে থাকতে হবে।
প্রকৃত পুরুষ কখনো এমন হারাম সম্পর্কে জড়ায় না। সে জানে যে কয়েক মুহূর্তের আনন্দের বিনিময়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টি কেনা চরম বোকামি।
৪. নারীদের সর্বোত্তম উপায়ে সম্মান করা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। ইসলাম পুরুষদের নারীর ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে বলে, কিন্তু একই সাথে নারীদের সম্মান করতেও বলে।
প্রকৃত পুরুষ তার মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাসহ জগতের সকল নারীর সাথে উত্তম আচরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" [তিরমিযী]
নারীর ফিতনা থেকে পালানো মানে তাকে তুচ্ছ করা নয়; বরং নিজেকে নিরাপদ রেখে নারীকে ইসলামের দেওয়া সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করাই হলো আসল পুরুষের বৈশিষ্ট্য ।
৫. বিবাহের মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখা
আজকের দিনের যুবকরা রিলেশন আর লিভ-ইনকে স্মার্টনেস মনে করে। কিন্তু প্রকৃত পুরুষত্বের পরিচয় হলো শরীয়তসম্মত বিবাহ। প্রকৃত পুরুষত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ হলো হালাল পথ বেছে নেওয়া। অর্থাৎ হারাম সম্পর্কে জড়ানো নয়, বরং বৈধভাবে বিবাহ করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
"হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিবাহ করা উচিত। কারণ এটি দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে সাহায্য করে।" [বুখারী ও মুসলিম]
বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়, এটি একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে একজন পুরুষ তার প্রবৃত্তিকে হালাল উপায়ে পূর্ণ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। তাই আসল পুরুষ সে-ই হয়, যে নোংরা হারাম সম্পর্কের চোরাবালিতে পা না দিয়ে রবের সন্তুষ্টির জন্য হালাল পথ বেছে নেয়। সে জানে, একটি পবিত্র বিবাহই পারে দৃষ্টিকে স্থির আর লজ্জাস্থানকে নিরাপদ রাখতে।
আজকাল অনেক যুবক জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে শরীর বানাচ্ছে, স্টাইলিশ দাড়ি আর দামি পোশাকে নিজেকে পরিপাটি রাখছে কিংবা আলফা মেল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পুরুষত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এই বাহ্যিক সাজগোজ আর গলার স্বরের গাম্ভীর্য বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না, যদি না নিজের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে।
একজন পুরুষ ততক্ষণ প্রকৃত পুরুষ হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নারীর সাথে সম্মানজনক আচরণ করতে শিখে, হারাম সম্পর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় লালন করে। মনে রাখবেন, আসল পুরুষত্ব পেশীর শক্তিতে নয়, বরং চারিত্রিক পবিত্রতায় হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শক্তিশালী বীর সেই ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়, বরং শক্তিশালী বীর সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।" [বুখারী ও মুসলিম]
আজকের যুগ ফিতনার যুগ। স্মার্টফোনে একটি ক্লিকেই হাজারো হারাম জিনিস সামনে এসে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটি স্ক্রলে চলে অশ্লীলতার প্রদর্শনী। চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও সবখানে নগ্নতা এবং অশ্লীলতা।
ফলে একজন যুবকের জন্য আজকের দিনে নিজেকে হারাম থেকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকার শক্তিও তিনি দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না।" [সূরা বাকারা: ২৮৬]
অর্থাৎ আল্লাহ যখন আমাদের কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, তখন সেই কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষমতাও তিনি আমাদের দিয়েছেন। শুধু প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতি এবং দৃঢ় সংকল্প।
আসুন কিছু পদক্ষেপের কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করি, যা এই যুগে এসব ফিতনা থেকে আপনাকে ও আপনাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার জন্যে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
১. দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করুন
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন, আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ’’তুমি তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও।’’ (মুসলিম)
কীভাবে অনুশীলন করবেন:
রাস্তায় হাঁটার সময় সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটুন, এদিক-সেদিক তাকাবেন না। যদি হঠাৎ নারীর দিকে দৃষ্টি পড়ে যায়, সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিন। এক সেকেন্ডও দেরি করবেন না।
মনে রাখবেন, প্রথম দৃষ্টি আপনার নিয়ন্ত্রণে না থাকায় ক্ষমা রয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি আপনার ইচ্ছাকৃত এবং এটি গুনাহ। আর দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ একটি অভ্যাস। প্রথম দিকে কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যাবে।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন: "দৃষ্টি হলো হৃদয়ের দূত। যখন দূত বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন হৃদয়ও বিশ্বাসঘাতকতা করে।"
২. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করুন
আজকের যুগে সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো স্মার্টফোন। এটি আপনার হাতে থাকা একটি ছোট্ট বাক্সের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো শয়তান প্ররোচনায় অংশ। এক্ষেত্রে এই বাঁচার জন্য আমাদের কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
১. Instagram, Facebook, TikTok, Twitter ইত্যাদি যেসব অ্যাকাউন্টে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও শেয়ার হয়, সেগুলো আনফলো করুন। এমনকি যদি সেটা আপনার বন্ধুর অ্যাকাউন্টও হয়।
২. প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় কত সময় ব্যয় করছেন তা মনিটর করুন। ফোনের Screen Time সেটিংস ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যাপের জন্য দৈনিক সীমা নির্ধারণ করুন। অতিরিক্ত হয়ে গেলে কমিয়ে আনুন।
৩. রাতে ঘুমানোর আগে ফোন বেডরুমের বাইরে রাখুন। এটি শুধু ফিতনা থেকে রক্ষাই করবে না, ভালো ঘুমেরও সহায়ক হবে। (অন্তত বেড থেকে দূরে রাখুন)
৪. আপনার ফোন ও কম্পিউটারে অশ্লীল ভিডিও বা পর্নোগ্রাফি ব্লকার সফটওয়্যার ইনস্টল করুন। এটি অনেক সময় হঠাৎ প্রলোভনের সময় আপনাকে রক্ষা করবে। (Kahf gaurd ব্যবহার করতে পারেন।)
৫. YouTube ও Netflix ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। এসব প্ল্যাটফর্মের algorithm এমনভাবে ডিজাইন করা যে আপনাকে সহজেই আসক্ত করে ফেলবে। তাই সাবধানে ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট দেখে বের হয়ে আসুন।
মনে রাখবেন, শয়তান আপনার পকেটে বসে আছে আপনার স্মার্টফোনের আকারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় অবাধ বিচরণ থেকে দূরে থাকুন।
৩. খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করুন
যেসব বন্ধু আপনাকে হারামের দিকে টানে, তাদের থেকে দূরে থাকুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
"মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনদারীর উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে দেখে নিক সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" [আবু দাউদ, তিরমিযী]
এক্ষেত্রে খারাপ বন্ধু থেকে দূরে দূরে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
• যারা আপনাকে গার্লফ্রেন্ড রাখতে উৎসাহিত করে
• যারা পর্ন দেখাকে স্বাভাবিক মনে করে
• যারা সলাত পড়ে না এবং আপনাকেও সলাত থেকে দূরে রাখে
• যারা মদ, জুয়া বা অন্যান্য হারাম কাজে জড়িত
• যারা নারীদের নিয়ে অশ্লীল আলোচনা করে ইত্যাদি
কিভাবে ভালো বন্ধু খুঁজবেন:
• নিয়মিত মসজিদে যান। সেখানে ভালো মানুষের সাথে পরিচিত হন।
• ইসলামিক স্টাডি সার্কেল বা হালাকায় যোগ দিন।
• অনলাইনে ভালো মুসলিম কমিউনিটির সাথে যুক্ত হন।
মনে রাখবেন, বন্ধু বদলানো সহজ নয়, কিন্তু আপনার আখিরাত এর চেয়ে বেশি মূল্যবান। কখনো কখনো একাকীত্ব খারাপ সঙ্গের চেয়ে অনেক ভালো।
৪. নিয়মিত ইবাদত করুন
হৃদয় যখন আল্লাহর যিকিরে পরিপূর্ণ থাকে, তখন শয়তানের জন্য সেখানে জায়গা থাকে না। সলাত, কুরআন তিলাওয়াত, দো'আ এগুলো হৃদয়কে শক্তিশালী করে। তাই দৈনিক ইবাদতের কিছু রুটিন তৈরি করুন:
ফজরের সলাত: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি ফজর জামাতে পড়ে, সে সারাদিন আল্লাহর হেফাজতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি ফজরের সলাত পড়ল, সে আল্লাহর জিম্মায় থাকল।" [মুসলিম]
কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা কুরআন পড়ার অভ্যাস করুন। সাথে কুরআনের অনুবাদ পড়ুন, অল্প অল্প তাফসীর পড়ার চেষ্টা করুন। কুরআন হৃদয়ে নূর নিয়ে আসে এবং শয়তান থেকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "যে ঘরে কুরআন পাঠ করা হয়, সে ঘর প্রশস্ত হয় এবং বরকত বৃদ্ধি পায়। আর যে ঘরে কুরআন পাঠ করা হয় না, সে ঘর সংকীর্ণ হয় এবং বরকতহীন হয়ে যায়।" [তিরমিযী]
তাহাজ্জুদ সলাত: রাতের শেষ তৃতীয়াংশে উঠে কয়েক রাকাত সলাত পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে মাফ চান। এটি আপনার ঈমান বৃদ্ধি করবে এবং গুনাহ থেকে রক্ষা করবে।
দো'আর অভ্যাস: প্রতিটি কাজের আগে দো'আ করুন। বিশেষ করে যখন ফিতনায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন বেশি বেশি "আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম" পড়ুন।
যিকির: "সুবহা-নাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার" ইত্যাদি যিকরগুলো বেশি বেশি করুন। সকাল-সন্ধ্যার যিকরগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করুন। এটি হৃদয়কে শান্ত রাখবে এবং খারাপ চিন্তা থেকে মুক্ত রাখবে ইন শা আল্লাহ।
৫. বিবাহের প্রস্তুতি নিন
যদি বিবাহের বয়স হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য চেষ্টা করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
"হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিবাহ করা উচিত। কারণ এটি দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে সাহায্য করে।" [বুখারী ও মুসলিম]
বিবাহের প্রস্তুতি যেভাবে নিবেন:
আর্থিক প্রস্তুতি: চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি করুন। মনে রাখবেন, বিবাহের জন্য কোটি টাকার দরকার নেই, দরকার স্থিতিশীল আয়ের।
চারিত্রিক প্রস্তুতি: নিজেকে একজন ভালো স্বামী হিসেবে গড়ে তুলুন। রাসূলুল্লাহর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী ভালোমত পড়ুন। তিনি কীভাবে তাঁর স্ত্রীদের সাথে আচরণ করতেন তা শিখুন।
পরিবারকে জানান: আপনার পরিবারকে জানান যে আপনি বিবাহ করতে চান। তাদের সাহায্য নিন উপযুক্ত মেয়ে খুঁজতে।
দো'আ করুন: আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রতিদিন দো'আ করুন, তিনি যেন আপনার জন্য একজন নেক্কার স্ত্রী নির্ধারণ করেন।
সাধারণ বিবাহ করুন: লক্ষ টাকার জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহের পেছনে না ছুটে সাধারণ ও সুন্নাহ মোতাবেক বিবাহ করুন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ সেই বিবাহ যাতে খরচ কম হয়।" [বায়হাকী]
৬. সাওম পালন করুন
যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ সমাধান দিয়েছেন:
"আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য (যৌন উত্তেজনা দমনের) ঢালস্বরূপ।" [বুখারী ও মুসলিম]
কীভাবে সাওম রাখতে পারেন:
সোমবার ও বৃহস্পতিবার: প্রতি সপ্তাহে এই দুই দিন সিয়াম রাখুন। এটি রাসূলুল্লাহর সুন্নাত এবং শারীরিক ও আত্মিক উভয় ক্ষেত্রে উপকারী।
আইয়ামে বীজের সিয়াম: প্রতি আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম রাখুন। এই তিন দিনের সিয়াম পূর্ণ মাসের রোজার সমতুল্য সওয়াব।
বেশি বেশি নফল সিয়াম: যখনই মনে হচ্ছে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হচ্ছে, তখন একটি নফল সিয়াম রাখুন। এতে নফস কন্ট্রোল হবে ইন শা আল্লাহ।
সাওম আপনার তাকওয়া বৃদ্ধি করবে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করবে। সাওম আপনাকে শেখাবে কীভাবে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
সম্মানিত ভাই, একদিনে সবকিছু পরিবর্তন হবে না। এটি একটি ধীর এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কখনো কখনো আপনি পিছলে যেতে পারেন, ভুল করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।" [সূরা বাকারা: ২২২]
যতবার পড়ে যাবেন, ততবার উঠে দাঁড়ান। তওবা করুন এবং আবার শুরু করুন। আল্লাহর রহমত অসীম এবং তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করতে ভালোবাসেন।
সবশেষে ভাইদের বলব, কথাগুলো নিজে মানার চেষ্টা করুন এবং ছেলে সন্তানদেরও কথাগুলো নসিহার সুরে বার বার স্মরণ করিয়ে দিন।
তাদের বলুন, শুধু পেশী বা উন্নত রুপ দিয়ে পুরুষত্ব প্রমাণ হয় না। প্রকৃত পুরুষত্ব প্রমাণ হয় সেই মুহূর্তে যখন সে একা, কেউ দেখছে না এবং হারামের সুযোগ সামনে থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহকে ভয় করে ফিরে আসে। সকল প্রকার বিবাহবহির্ভূত রিলেশন থেকে দূরে থাকে।
তাদের জন্যেই তো আল্লাহ তা'আলা পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা সেই সাতজনকে তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন যেদিন তাঁর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, তাদের মধ্যে একজন হলো সেই যুবক যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী (হারামের দিকে) আহ্বান করেছে, কিন্তু সে বলেছে: আমি আল্লাহকে ভয় করি।" [বুখারী ও মুসলিম]
এই হাদিসে দেখুন, আল্লাহ কীভাবে সেই যুবকের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন যে তাঁকে ভয় করে হারাম থেকে বেঁচে ছিল। আপনিও সেই সম্মানিত যুবকদের একজন হতে পারেন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে প্রকৃত পুরুষত্ব অর্জনের তাওফিক দিন। তিনি আমাদের দৃষ্টি পবিত্র রাখুন, হৃদয়কে ঈমানে পরিপূর্ণ করুন এবং সকল ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। তিনি আমাদের সন্তানদেরকেও সৎ ও চরিত্রবান করে গড়ে তুলুন। যারা অবিবাহিত, তাদের জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করুন এবং আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
